নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট এলাকায় প্রায় ২০ হাজার বর্গফুট জমিতে গড়ে ওঠা সরস্বতী জ্ঞান মন্দিরের দ্বার খুলছে অক্ষয় তৃতীয়া তিথিতে, সোমবার (২০ এপ্রিল)। আট বছর ধরে চলা কাজ শেষে নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীর এই মন্দির উৎসর্গ এবং শ্রীবিগ্রহ প্রতিষ্ঠা হবে এদিন।সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দেবী সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হলেও স্থায়ী উপাসনালয়ের অভাবে শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি আয়োজনে প্রতিবন্ধকতা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, অধ্যয়নরত সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত সনাতন ধর্ম পরিষদের দাবির প্রেক্ষিতে ২০১১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মন্দির নির্মাণের জন্য জায়গা বরাদ্দ দেয়।
এরপর শুরু হয় মন্দির প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থানের চেষ্টা। সনাতন ধর্ম পরিষদের উদ্যোগে প্রাথমিক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, দেশে-বিদেশে অবস্থানরত প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অনুদানে মন্দির কমপ্লেক্সের উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয়।
চারপাশের দেয়াল নির্মাণ, রিটেনশন ওয়াল নির্মাণ ও মাটি ভরাটের কাজ শেষে এখানেই খোলা আকাশের নিচে চলতো বার্ষিক সরস্বতী পূজার আয়োজন। এসময় আর্থিকভাবে সহায়তা করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সনাতনী শিক্ষক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও সমাজের সুধীজনরা।
বিষয়টি প্রবাসী ব্যবসায়ী অদুল কান্তি চৌধুরীকে জানালো হলে তিনি বাড়িয়ে দেন সহায়তার হাত। মন্দিরের নকশা ও প্রকৌশল সহায়তা দিয়েছে ‘এস্ট্রো’, ইনটেরিয়র ও কারিগরি সহায়তা দিয়েছে ‘দি-অ্যাড কমিউনিকেশন’। প্রশাসনিক, নিরাপত্তা, বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রী ও ইউটিলিটি সহায়তা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ২০১৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন উপাচার্যকে নিয়ে মন্দির নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন অদুল-অনিতা ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি অদুল কান্তি চৌধুরী ও অনিতা চৌধুরী। মূল মন্দির ‘সরস্বতী জ্ঞান মন্দির’ নির্মাণে সম্পূর্ণ আর্থিক অনুদান দেন এই যুগল। নির্মাণকাজ তদারকি করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত মন্দির নির্মাণ কমিটি ও মন্দির পরিচালনা কমিটি। সমন্বয় করেছে চবি সনাতন ধর্ম পরিষদ। সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন প্রয়াত বাদল কান্তি চৌধুরী ও বিশ্বজিৎ দাস।
চবি কেন্দ্রীয় মন্দির উদ্বোধন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. তাপসী ঘোষ রায় বলেন, ‘জ্ঞানই শক্তি, জ্ঞানই মুক্তি। এখন থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান মন্দিরে প্রতিদিন পূজিত হবেন জ্ঞানের দেবী সরস্বতী। মন্দিরের কার্যক্রম শুধু পূজা ও উপাসনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একে আধ্যাত্মিক চর্চা এবং মানব কল্যাণমুখী কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। প্রজ্ঞাবান মানবসম্পদ গড়ে তোলার জন্য পেশাগত জ্ঞানের পাশাপাশি আধ্যাত্মিক জ্ঞান চর্চার গুরুত্ব অপরিসীম। দানবীর অদুল কান্তি চৌধুরীর মতো অন্যান্য দাতাদের অনুদানে পূরণ হবে আমাদের ভবিষ্যতের স্বপ্নগুলো’।
এখানে একটি বৈদিক গ্রন্থাগার, আধ্যাত্মিক জ্ঞান চর্চায় নিয়মিত সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম আয়োজনে অডিটোরিয়াম, শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক উৎকর্ষ সাধনে ধ্যানকেন্দ্র, সনাতনী শিক্ষার্থীদের আবাসিক সমস্যা দূর করার জন্য একটি আবাসিক হল নির্মাণের পরিকল্পনা আছে বলে জানালেন চবি কেন্দ্রীয় মন্দির উদ্বোধন কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. অঞ্জন কুমার চৌধুরী। তিনি বলেন, দুর্যোগকালীন সাহায্য এবং দরিদ্রদের সহায়তায় জন্য কল্যাণ তহবিল গঠনের মাধ্যমে পরিচালিত হবে সেবামূলক কর্মকাণ্ড। সরস্বতী জ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পূরণ হয়েছে চবি’র সনাতনী সদস্যদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন-ক্যাম্পাসে একটি স্থায়ী উপাসনালয়।
সরস্বতী জ্ঞান মন্দির নির্মাণে এগিয়ে আসা প্রসঙ্গে অদুল কান্তি চৌধুরী বলেন, ‘এমন শুভ কাজে অংশগ্রহণ করতে পারা সৌভাগ্যের। সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা মন্দিরের অভাবে ধর্মচর্চায় অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছে, এটা জেনে মন্দির নির্মাণে এগিয়ে এসেছি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে জমি চেয়েছি, যেখানে তিন শতাধিক গরীব শিক্ষার্থীর জন্য ৫ তলা ভবন নির্মাণের ইচ্ছে আছে। পাশাপাশি ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা যাতে সেখানে থাকতে পারেন, সেই ব্যবস্থাও গড়ে দিতে চাই’।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আল-ফোরকান বলেন, একটি দৃষ্টিনন্দন মন্দির স্থাপনের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ধর্মীয় সম্প্রীতির নতুন নজির স্থাপন করেছে । যেহেতু এটি একটি শিক্ষাঙ্গন এবং সনাতন ধর্মবিশ্বাস অনুসারে দেবী সরস্বতী হলেন বিদ্যাদেবী, তাই এই মন্দিরটি বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনের জন্য যথাযথ এবং গুরুত্বপূর্ণ। এটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি পবিত্র প্রাণকেন্দ্র হবে। এই উদ্যোগ সফল করতে বড় ভূমিকা রেখেছেন দানবীর অদুল চৌধুরী। তাঁর আর্থিক অনুদান এবং আরও অনেক ধর্মপ্রাণ মানুষের সার্বিক সহযোগিতায় মন্দিরটি আজ পূর্ণতা পেয়েছে। আশা করি, এই মন্দির বিশ্ববিদ্যালয়ের আধ্যাত্মিক পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ করবে।




