২৮শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য : জামায়াত জোটের ২৫৩ আসনে প্রার্থী ঘোষণা

অনলাইন ডেস্ক: শীর্ষস্থানীয় নেতাদের দফায় দফায় বৈঠক আর আসন ভাগাভাগি নিয়ে নাটকীয়তার অবসান ঘটিয়ে ঘোষণা করা হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী জোটের প্রার্থিতা। নতুন এই জোটের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ’। তবে গতকাল বৃহস্পতিবারও সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিল না ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
গতকাল রাত ৮টা ৩০ মিনিটে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের ব্যানারে ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ নামে নতুন করে এই জোট ঘোষণার অনুষ্ঠানে আসন বণ্টনের বিষয়ে বলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের।
তিনি জানান, এখন পর্যন্ত ২৫৩টি আসনে প্রার্থিতা ঘোষণা করেছে ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ নামে নতুন এই জোট। ঘোষণায় ১৭৯টি আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেওয়ার কথা জানানো হয়। এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৩০টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২০টি, খেলাফত মজলিস ১০টি, এলডিপি সাতটি, নেজামে ইসলাম পার্টি দুটি, আমার বাংলাদেশ পার্টি তিনটি ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি দুটি আসন পেয়েছে। জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি ও খেলাফত আন্দোলন বাংলাদেশ জোটে থাকলেও তাদের আসনের বিষয়ে এখনো কিছু জানানো হয়নি।অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জন্য ৪০ থেকে ৪৫টি আসন খালি রেখেছে ১১ দলীয় জোট।তাহের বলেন, ‘এই নির্বাচন হবে অস্তিত্ব রক্ষার নির্বাচন। সংস্কারের পক্ষে একটি নির্বাচন। বাংলাদেশের ইতিহাসে সব মতকে ধারণ করে এত বড় জোট এর আগে কখনো হয়নি।ওয়ান বক্স পলিসিতে আমরা একসঙ্গে হব। সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কয়েকটা আসনে এখনো সিদ্ধান্ত নেওয়া বাকি, তা জানানো হবে।’


সূচনা বক্তব্যে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘আমাদের এই যাত্রা শুরু হয়েছে জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। এরপর সংস্কার, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তিসহ নানা দাবিতে রাজনীতির দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে আমরা এতদূর এসেছি।আজ আমরা সমঝোতার বিষয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছি।’ এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এটা আমাদের ঐতিহাসিক যাত্রা, ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আমরা ৩০০ আসনে সবাই সবাইকে সহযোগিতা করব, হ্যাঁ ভোটকে জয়যুক্ত করব।’
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘তোমরা নিজেদের ভোট দিতে আসবা এবং ভোটের হিসাব নিয়ে ঘরে ফিরবা।’ জোটের ঘোষণার শুরুতে তিনি জুলাই যোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির হত্যার বিচার দাবি করেন। জামায়াত আমির বলেন, এমন বিপ্লবীদের হত্যার বিচার না হলে বিপ্লবী তৈরি হবে না।
জোটের ভাঙন নিয়ে গত দুই দিনের টানা গুঞ্জন ও উৎকণ্ঠা নিয়ে একের পর এক বৈঠক করেও গতকাল আসন সমঝোতার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি দলগুলো। শেষ পর্যন্ত গতকাল রাতে জোটের সংবাদ সম্মেলনে আসেনি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুস আহমদ জানান, জোটে থাকার বিষয় কালকে পুরোপুরি বলা যাবে। এখনো আলোচনা ও বৈঠক চলছে।এর মধ্যে আজ শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনের ডাক দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন। বিকেল ৩টায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নির্বাচনী সমঝোতার বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করবে তারা।
জানা গেছে, মূলত জোটের দুই শক্তিশালী দল জামায়াতে ইসলামী ও চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে আসন সমঝোতা বজায় রাখাই ছিল জোটের শেষ মুহূর্তের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এক সপ্তাহ ধরে দফায় দফায় বৈঠক ও দীর্ঘ আলোচনার পরও তা এখন পর্যন্ত সফল হয়নি।
সর্বশেষ গতকাল বিকেলে তারা নিজেদের মধ্যে বৈঠক করে। এর আগে সকাল থেকেই রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে, আসন বণ্টন দ্বন্দ্বে ১১ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে ইসলামী আন্দোলন। দলটির পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছিল ৬৫ থেকে ৭০টি আসন না ছাড়া হলে তাদের পক্ষে জোটে থাকা সম্ভব নয়।১০ দলের বৈঠকে ছিল না ইসলামী আন্দোলন
গত দুই দিন জোটের নাটকীয়তার মধ্যে সংসদ নির্বাচনের আসন ভাগাভাগি চূড়ান্ত করতে বৈঠকে বসেন জোটের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। কিন্তু বৈঠকে ইসলামী আন্দোলনের কেউ ছিলেন না। জামায়াতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বাকি ১০ দলের নেতাদের নিয়ে জোটের বৈঠক দুপুর ১২টায় শুরু হয়ে বিকেল পৌনে ৩টার দিকে শেষ হয়। বৈঠকে ইসলামী আন্দোলন না থাকলেও তাদের জন্য নির্দিষ্ট আসন রেখেই আসন বণ্টন চূড়ান্ত করেছে জামায়াত। বাকি ২৫০ আসনে সমঝোতা করেছে জামায়াতসহ ১০ দল।
নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, বৈঠক চলাকালে ইসলামী আন্দোলনের আমির মুফতি সৈয়দ রেজাউল করীম চরমোনাই পীরের সঙ্গে ফোনকলে কথা বলেন জোট নেতারা। সেখানে ইসলামী আন্দোলনকে ক্ষমতায় বা বিরোধী দলে গেলে জোটের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। চরমোনাই পীরের পক্ষ থেকেও জোটে থাকার ব্যাপারে নমনীয়তা পোষণ করা হয়। শেষ মুহূর্তে কোনো পক্ষই জোটের ভাঙন চায় না বলেও আশ্বস্ত করা হয়েছে।
মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ১০ দলের নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ইউসুফ সাদিক হক্কানী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুল মাজেদ আতহারী, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বিডিপির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম চাঁদ প্রমুখ।বৈঠক থেকে বের হয়ে ডা. তাহের বলেন, ‘আমরা আজকের বৈঠকে ইসলামী আন্দোলনের জন্য প্রাপ্য আসন সমঝোতার মাধ্যমে সব দলের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে ঠিক করেছি, তাদের জন্য আসন রেখেই আমরা চূড়ান্ত করেছি।’ইসলামী আন্দোলনকে এক করে চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করার আশা প্রকাশ করেন মাওলানা মামুনুল হক। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা একসঙ্গে এগিয়ে যেতে পারব।’
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, আসন সমঝোতা হলেও ১১ দলীয় জোটের রাজনৈতিক গুরুত্ব আছে। এই জোট নিয়ে জনগণের মধ্যে একটি বড় আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে এবং এটা জনগণ বোঝে। প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উত্তরণ হবে, এটা সবার প্রত্যাশা। যেসব মতভিন্নতা হয়েছে, অল্প সময়ের মধ্যে সেগুলো কেটে যাবে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের সংস্কার ভাবনা, আধিপত্যবাদ ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে সামনে রেখে ঐক্যবদ্ধভাবেই আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব। ৩০০ আসনে কোনো দলীয় প্রার্থী হবে না, সবাই জোটের প্রার্থী হবে। সবাই সবাইকে সহযোগিতা করবে।’
জামায়াত জোটের ২৫৩ আসনে প্রার্থী ঘোষণা
নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন রাশেদ প্রধান : জোটের বৃহত্তর স্বার্থে আসন্ন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন জাগপা মুখপাত্র রাশেদ প্রধান। গতকাল বিকেলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, “ঐক্যের বৃহত্তর স্বার্থে আমি এবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব না। গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে এবং ঐক্যের প্রার্থীদের হয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করব ইনশাআল্লাহ। আমাকে যাঁরা ভালোবাসেন, তাঁরা দয়া করে মন খারাপ করবেন না। ব্যক্তি রাশেদ প্রধানের চেয়ে আমাদের সমঝোতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
পঞ্চগড়-১ ও পঞ্চগড়-২ আসন থেকে নির্বাচন করার জন্য মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন রাশেদ প্রধান। তবে ১১ দলের পক্ষ থেকে পঞ্চগড়-১ আসনটি এনসিপির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম ও পঞ্চগড়-২ আসনটি জামায়াতের বোদা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. সফিউল্লাহ সুফির জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন