৬ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

প্রয়াণ দিবস স্মরণে : মাইজভান্ডারী গানের জনক কবিয়াল রমেশ শীল

অনলাইন ডেস্ক: মাইজভান্ডারী গীতিকার অন্যতম কবিকুল সম্রাট এবং একুশে পদকপ্রাপ্ত উপমহাদেশের শ্রেষ্ট কবিয়াল চট্টগ্রামের কৃতী কবি রমেশ শীল এর ৫৯তম প্রয়াণ দিবস সোমবার ৬ এপ্রিল। ১৯৬৭ সালের ৬ এপ্রিল ৯০ বছর বয়সে চিরবিদায় নেন তিনি। তার অসামান্য সংগীত সাধনা আজও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জনপ্রিয়।বাংলা ২৩ শে চৈত্র তার প্রয়াত দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে নানা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
মহাকবির স্মরণে “কবিয়াল রমেশ স্মৃতি ট্রাস্ট” গঠন করা হয়েছে। দুই বছরের মেয়াদী পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটিতে চেয়ারম্যান করা হয়েছে সত্যজিৎ শীল ভূট্টো শীলকে।গত শুক্রবার সকালে কবিয়াল রমেশ পরিবারের সদস্যবৃন্দ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিশেষ ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে জরুরি এক সভায় এ কমিটি গঠন করা হয়।
সর্বসম্মতিক্রমে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট এ কমিটিতে বাকি চার সদস্যের মধ্যে কবিয়াল রমেশ পরিবারের সদস্য দৈনিক চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিনের উপেদষ্টা সম্পাদক ও প্রকাশ মানস চৌধুরীকে সহ সভাপতি, মৃণাল শীলকে সাধারণ সম্পাদক, কাজল শীলকে কোষাধ্যক্ষ ও ননী গোপল শীলকে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে।
তাছাড়া সভায় “কবিয়াল রমেশ স্মৃতি ট্রাস্ট” সভাপতি সত্যজিৎ শীল ভূট্টো শীলের নির্দেশে আগামীকাল মহাকবির মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বিভিন্ন আয়োজনের সিন্ধান্ত গৃহিত হয়।
আলোচনা সভা ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান উদযাপন সুষ্ঠ ও সুন্দর করার লক্ষ্যে পৃথক ২১ সদস্য বিশিষ্ট মৃত্যুবাষির্কী উৎযাপন কমিটি গঠন করা হয়েছে।এ কমিটিতে শিক্ষক ও সাংবাদিক প্রলয় চৌধুরী মুক্তিকে আহব্বায়ক ও ইন্জিনিয়ার মাইকেল শীলকে সদস্য সচিব করা হয়েছে।দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালায় রয়েছে সকাল ১০টা ১ মিনিটে কবির সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, বিকেল ৩টায় রমেশ সঙ্গীতানুষ্ঠান, ৭টায় চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যাক্তিগণের উপস্থিতিতে আলোচনা সভা এবং রাত ১০টার দিকে কবি গানের আসর।
জীবন ও সংগীত সাধনা: কবিয়াল রমেশ শীলের জন্ম ১২৮৪ বঙ্গাব্দের ২৬ বৈশাখ, ১৮৭৭ সালে বোয়ালখালীর গোমদণ্ডী গ্রামের শীল পাড়ায়। চণ্ডিচরণ শীল ও শ্রীমতি রাজকুমারী দম্পতির একমাত্র পুত্রসন্তান রমেশচন্দ্র শীল। তাঁর অন্য তিন সহোদরা সতনী বালা, গয়া বালা ও সরোজনী বালা।পিতা চণ্ডিচরণ শীল ছিলেন কবিরাজ। পারিবারিক অভাবের মধ্যেও রমেশ শীল ছোটবেলা থেকেই গান-বাজনার প্রতি গভীর আগ্রহী ছিলেন।সাত বছর বয়সে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া রমেশ শীলের গানচর্চা ছিল অপরিসীম। ১৮৮৮ সালে পিতার মৃত্যুর পর পড়াশোনা অর্ধেকেই শেষ করতে হয়, কিন্তু তিনি কবিগানের সঙ্গে যুক্ত থেকে অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক চেতনার গান রচনা করে গাইতে থাকেন।
কবিয়াল পরিবারের সদস্য দৈনিক চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিনের উপেদষ্টা সম্পাদক ও প্রকাশক মানস চৌধুরী তার সম্পর্কে বলেন, ঠাকুদা ও বাবার মুখে শুনেছি শৈশবে গ্রামের প্রাথমিক স্কুলে পাঠ নেবার সময় থেকেই কবিগানের আসরে গান শুনতে যেতেন তিনি। কবিয়ালাদের গানের লড়াই আর তরজা গান তাঁকে ভীষণ টানতো।কখনো কখনো রমেশের বাড়ির উঠোনেই বসতো গানের লড়াই। মুগ্ধ হয়ে শুনতেন রমেশ আর মুখস্থ করে মুখে মুখে গাইতেন। সকলে তারিফও করতো। স্কুলে তিনি ছিলেন মেধাবী ছাত্র। কিন্তু মাত্র এগারো বছর বয়সে পিতৃহীন হলে লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে জীবন সংগ্রামে নেমে পড়তে হয় তাঁকে।মানস চৌধুরী আরও বলেন, রমেশ শীল কবিগানের সাথে পুরোপুরি যুক্ত হন যুবক বয়সে। কবিগানের প্রচলিত চিত্তবিনোদনের ধারা ভেঙে তিনি তাতে যুক্ত করেন অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক চেতনা।
কবিয়াল রমেশ শীল ছিলেন আন্তর্জাতিক সমস্যা ও সামাজিক বিষয় সম্পর্কে সচেতন। তাঁর গানের বাণী ছিল শান্তির পক্ষে। সমসাময়িক নানা ঘটনা, সামাজিক, রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়, যেমন, অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলন, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, সূর্যসেন-প্রীতিলতার বীরত্বগাথা প্রভৃতি বিষয়ও তাঁর গানের অনুষঙ্গ হয়েছে।কোনো কোনো গানে কালোবাজারি, মুনাফাখোর, মজুতদার আর শোষকের বিরুদ্ধে ধ্বনিত হয়েছে তীব্র প্রতিবাদ। এসেছে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা এবং শিক্ষাকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেবার আহ্বান।
বাংলা একাডেমি থেকে তার সমগ্র রচনাবলী প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৪৮ সালে কলকাতার শ্রদ্ধানন্দ পার্কে তিনি “বঙ্গের শ্রেষ্ঠ কবিয়াল” উপাধি পান।
মাইজভান্ডারী গানের জনক: দৈনিক চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিনের প্রকাশক মানস চৌধুরী বলেন, রমেশ শীল মাইজভান্ডারী তরিকারও অনুসারী ছিলেন। এই ধারা নিয়েও তিনি অনেক গান রচনা করেন। বাংলা একাডেমী থেকে তাঁর সমগ্র রচনাবলী প্রকাশিত হয়েছে।
রমেশ শীলকে মাইজভান্ডারী গানের জনক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তিনি সহস্রাধিক গান লিখেছেন মাইজভান্ডারী সম্পর্কিত। তার গানগুলোতে অসহযোগ আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন, সূর্যসেন-প্রীতিলতার বীরত্ব, কালোবাজারি, মুনাফাখোর ও শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি বিষয় উঠে এসেছে।তার লেখা ও গাওয়া ইস্কুল খুইলাছেরে মওলা ইস্কুল খুইলাছে, গাউসুল আজম মাইজভান্ডারী ইস্কুল খুইলাছে। চট্টগ্রামের মানুষ এই গানটির সাথে বেশ পরিচিত।চট্টগ্রাম ছাড়াও বিশ্বের বুকে জায়গা করে নিয়ে এই গানটি, যা আজো বেশ জনপ্রিয়তার তুঙ্গে অবস্থান করছে।
স্বীকৃতি ও সুনাম: জীবদ্দশায় অসংখ্য সংবর্ধনা পান তিনি। ১৯৪৮ সালে কলকাতায় শ্রদ্ধানন্দ পার্কে “বঙ্গের শ্রেষ্ঠ কবিয়াল” উপাধি লাভ করেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকায় কারান্তরীণ থাকা অবস্থায় সহবন্দীরা তাঁকে সংবর্ধিত করেছেন।১৯৬২ সালে বুলবুল একাডেমি ও ১৯৬৪ সালে চট্টগ্রামে নাগরিক সংবর্ধনা এবং ২০০২ সালে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত হন তিনি।এছাড়া ২০২৩ সালের নতুন ৭ম শ্রেণির শিক্ষাক্রমে তার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস পাঠ্যসূচিতে স্থান পেয়েছে। যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রমেশ শীল সম্পর্কে জানতে পারে।
সমবেদনা ও স্মরণ: এই কিংবদন্তি ১৯৬৭ সালের ৬ এপ্রিল ৯০ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন। রমেশ শীলের মৃত্যুতে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ তার প্রতি শ্রদ্ধা জানান।মাইজভান্ডারী গানের কিংবদন্তি রমেশ শীলের গান আজও প্রজন্মের প্রেরণা। তার সৃষ্টিশীলতা ও মানবিক চেতনা চট্টগ্রামসহ উপমহাদেশের মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে আছে।
পরিবারবর্গের দাবি:কবিয়াল রমেশ পরিবারের সদস্য দৈনিক চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিনের উপেদষ্টা সম্পাদক ও প্রকাশ মানস চৌধুরী বলেন, গেল ১৯ বছর আগে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরশেদ খান ও মন্ত্রী আব্দুল্লাহ আল নোমানসহ দলটির সিনিয়র নেতৃবৃন্দরা কবির স্মরণে রমেশ কমপ্লেক্স ঘোষণা করে একটি ফাইল মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলেন। পরবর্তীতে স্বৈরাচারি আওয়ামী লীগ শাসক ক্ষমতায় এলে ফাইলটি মন্ত্রণালয়ে আটকে যায়। তিনি পরিবারের পক্ষ থেকে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন এবং কবি রমেশ শীলের নামে উপজেলা সদর বা গোমদণ্ডী ফুলতল এলাকায় সাংস্কৃতিক একাডেমি বা তোরণ নির্মাণের দাবি করেছেন।

 

আরও পড়ুন