দেলোয়ার হোসেন বাদল: সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিএনপির নির্বাচনী সমাবেশ ও কর্মসূচিতে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের ধারাবাহিক উপস্থিতি রাজনৈতিক অঙ্গনে কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। বরাবরই রাজনীতির বাইরে থাকা জুবাইদা রহমানের এই দৃশ্যমান অবস্থান দলীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় রাজনীতিতেও নানা প্রশ্ন তুলছে—এটি কি শুধুই পারিবারিক উপস্থিতি, নাকি ভবিষ্যতে বিএনপির নেতৃত্বে তার আগমনের ইঙ্গিত?
পেশায় চিকিৎসক জুবাইদা রহমান আগে কখনো সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন না। তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি একাধিকবার দেশে এসে অসুস্থ শাশুড়ি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা দেখভাল করেছেন। সে সময় থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়—বিএনপির কোনো দায়িত্ব কি ধীরে ধীরে জুবাইদা রহমানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে?
তখন বিষয়টি স্পষ্ট রাজনৈতিক রূপ না পেলেও, সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচারণা, জনসভা ও বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে তারেক রহমানের পাশে জুবাইদা রহমানের নিয়মিত উপস্থিতিকে অনেকেই আর কাকতালীয় বলে মনে করছেন না।
কয়েকটি সমাবেশে তারেক রহমান নিজেই বলেছেন, “এই যে আমি এত রাতে মিটিং করছি, রাজনীতি করছি—আমার স্ত্রী সহযোগিতা না করলে আমি পারতাম না। উনি আছেন বলেই আমি পেরেছি।” তারেক রহমানের এই বক্তব্য এবং জুবাইদা রহমানের দৃশ্যমান উপস্থিতি আলোচনাকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মেবাশ্বের হোসেন টুটুল বলেন, তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রচারণায় জুবাইদা রহমানের উপস্থিতি মূলত রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের একটি সাংস্কৃতিক বার্তা বহন করে।
জিয়া পরিবারে বেড়ে ওঠার সুবাদে পরিবারের নারী সদস্যকে গুরুত্ব দেওয়ার যে সংস্কৃতি, তার প্রতিফলন তারেক রহমানের আচরণে দেখা যায়। পশ্চিমা বিশ্বে দীর্ঘদিন অবস্থানকালে তিনি নারীর ভূমিকা ও অংশগ্রহণকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। নারীর হাতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার যে পরিকল্পনার কথা তারেক রহমান বলেছেন, সেটিও নারীর ক্ষমতায়নের আরেকটি ধাপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তিনি বলেন, আধুনিক সময়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কাউকে নির্বাচনের ক্ষেত্রে তার পারিবারিক স্থিতি ও মানসিক প্রশান্তিও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
একজন নেতার সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার পারিবারিক পরিবেশ কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সে ক্ষেত্রে জনগণের সামনে শুধু নেতা নয়, তার পরিবারকে উপস্থাপন করার মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার একটি পথ তৈরি হয়।
এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরও বলেন, তারেক রহমান মূলত এই বার্তাই দিতে চান—শুধু ব্যক্তি তারেক রহমান বা তার দলই জনগণের সেবা করবে না, বরং পরিবারগুলোও পুরুষের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করবে, নারী-পুরুষ উভয়ের অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশ পরিচালিত হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক খালিদ আহমেদ বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পাশাপাশি তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও নির্বাচনী প্রচারণা ও রাজনৈতিক আলোচনায় যুক্ত হচ্ছেন। এর মধ্য দিয়ে একটি স্পষ্ট বার্তা আসে—তিনি কার্যত রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন।
যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি কোনো দলীয় পদে নেই, তবে রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ মানেই রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা। যেহেতু তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন, ভবিষ্যতে তার নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা নেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়িত হলে এবং আগামী নির্বাচনে তারেক রহমান বিজয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হলে বিএনপির দলীয় নেতৃত্বে কে আসতে পারেন, এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপির রাজনীতি ঐতিহাসিকভাবে জিয়া পরিবারকেন্দ্রিক। সে ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে শুধু ডা. জুবাইদা রহমান নন, তার কন্যা জাইমা রহমানও দলীয় প্রধান বা সরকারপ্রধান হিসেবে সামনে আসতে পারেন।
খালিদ আহমেদ আরও বলেন, জাইমা রহমান ইতোমধ্যে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এবং নির্বাচনী পরিচালনাসহ দলের বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। পারিবারিক রাজনীতির একটি ধারাবাহিকতা এখানে স্পষ্ট। তবে ডা. জুবাইদা রহমান বা জাইমা রহমানের দলীয় শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত হওয়া সময়সাপেক্ষ বিষয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি বর্তমানে সাংগঠনিক পুনর্গঠন, নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা এবং জনসমর্থন পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করছে। এই প্রেক্ষাপটে একটি গ্রহণযোগ্য নারী মুখ সামনে আনা কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক বশির ইবনে মুসা মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে মঞ্চের দৃশ্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কাউকে পাশে রাখা অনেক সময় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়। জুবাইদা রহমানের উপস্থিতিকে তাই নিছক পারিবারিক উপস্থিতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।বিএনপির ভেতরে আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কিছু বলা না হলেও, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে মঞ্চের দৃশ্যই অনেক সময় বড় বার্তা বহন করে।
এদিকে সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর এক শীর্ষ নেতা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, তাদের দলীয় কাঠামোয় আমির পদে নারীর কোনো সুযোগ নেই। এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি করেছে। ঠিক একই সময়ে বিএনপির মঞ্চে জুবাইদা রহমানের উপস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার কন্যা জাইমা রহমানের দৃশ্যমানতা একটি বৈপরীত্য তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত যেখানে নারী নেতৃত্বের সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করছে, সেখানে বিএনপি নারী নেতৃত্বকে সামনে আনতে আগ্রহী—এমন ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
এছাড়া আলোচনায় রয়েছে জুলাই জাতীয় সনদের একটি প্রস্তাবিত ধারা। এতে বলা হয়েছে, কেউ প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি হলে একই সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান বা সাধারণ সম্পাদক থাকতে পারবেন না। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে বিএনপি সরকার গঠন করলে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে তাকে দলীয় প্রধানের দায়িত্ব ছাড়তে হবে।
এই বাস্তবতায় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে নতুন মুখ আসার সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। সেই আলোচনায় ডা. জুবাইদা রহমানের নাম উঠে এলেও দলীয়ভাবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত বা স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই। বিএনপির নেতারা বলছেন, আপাতত দলের সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
সাধারণ মানুষের আলোচনাতেও বিষয়টি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার মেরাজনগর আদর্শ বিদ্যালয়ের শিক্ষক জাকির খান বলেন, জুবাইদা রহমান একজন চিকিৎসক এবং পারিবারিকভাবে মেধাবী। তার উপস্থিতি বিএনপির রাজনীতিতে মানবিক ও ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করছে। ভবিষ্যতে তিনি দলীয় প্রধানের দায়িত্ব নিলে দল উপকৃত হতে পারে এবং দলকে আরও গতিশীল করতে পারবেন।
গণমাধ্যমকর্মী জেসমিন জুইয়ের মতে, নারীর নেতৃত্বকে আরও এগিয়ে নেওয়া জরুরি। তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া নারীদের শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় ডা. জুবাইদা রহমানও নারীদের এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দিচ্ছেন। তিনি বোঝাতে চান, নারী হিসেবে আমরা পুরুষের পাশে থেকে দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রাখতে পারি।
তিনি বলেন, এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট, ডা. জুবাইদা রহমান বিএনপির কোনো দলীয় পদে নেই। কিন্তু সমাজ পরিবর্তন বা সেবার জন্য দলীয় পদ অপরিহার্য নয়। যেমন বেগম রোকেয়া কোনো রাজনৈতিক পদে ছিলেন না, তবুও তিনি নারীদের শিক্ষা আন্দোলনের পথিকৃৎ ছিলেন। মূল প্রশ্ন হলো, কে সমাজের জন্য কাজ করতে চান।
আরেকটি প্রসঙ্গ হলো জুলাই সনদ। তারেক রহমান এই সনদে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সনদটি বাস্তবায়িত হলে দলীয় প্রধান রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী হলে তাকে দলীয় পদ ছাড়তে হবে। এতে নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ডা. জুবাইদা রহমান বা তার কন্যা জাইমা রহমান নেতৃত্বে আসবেন কি না—এই প্রশ্নে ব্যক্তিগতভাবে আমি এখনই তা দেখি না। কারণ এতে পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ আসতে পারে। বিএনপি একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল। নেতৃত্ব নির্ধারণ সম্পূর্ণভাবে দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়।
অন্যদিকে, কেউ কেউ মনে করছেন, এটি অতীতের মতো পরিবার কেন্দ্রিক রাজনীতির ধারাবাহিকতায় এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত। তাদের মতে, দলের ভেতরে অনেক অভিজ্ঞ ও ত্যাগী নেতা রয়েছেন, যারা শীর্ষ পদ পাওয়ার যোগ্য। তাদের উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতে দলের ক্ষতি হতে পারে।
তবে রাজনৈতিক সচেতন মহলের বড় অংশের অভিমত, তারেক রহমানের পাশে ডা. জুবাইদা রহমানের ধারাবাহিক উপস্থিতি নিছক কাকতালীয় নয়। এটি শেষ পর্যন্ত প্রতীকী পর্যায়ে থাকবে, নাকি বাস্তব রাজনৈতিক রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে সময় ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।





