নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার ঘটনায় চলমান আন্দোলনের বিষয়ে নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, দেশের স্বার্থে চুক্তি সম্পন্ন হবে এবং বিশৃঙ্খলা দমনে সরকার কঠোর অবস্থানে থাকবে।
বৃহস্পতিবার সকালে নৌপরিবহন উপদেষ্টা চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে নেমে বন্দরে আসার খবর ছড়িয়ে পড়লে শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সকাল পৌনে ১১টার দিকে উপদেষ্টা বন্দর ভবনে প্রবেশের চেষ্টা করলে কয়েক শ আন্দোলনকারী তার গাড়ি ঘিরে ধরেন। এ সময় ‘গো ব্যাক অ্যাডভাইজার’, ‘ডিপি ওয়ার্ল্ডের দালালরা হুঁশিয়া ‘সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন তারা। প্রায় ১৫ মিনিট উপদেষ্টার গাড়ি আটকে থাকে। পরে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় তিনি বন্দর ভবনে প্রবেশ করেন।
বিক্ষোভের মুখে একপর্যায়ে উপদেষ্টা গাড়ি থেকে নেমে আন্দোলনকারীদের সাথে কথা বলেন। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহীম খোকন এ সময় অভিযোগ করেন, বর্তমান চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামান গত দেড় বছরে শ্রমিকদের নানাভাবে হয়রানি করেছেন। শ্রমিকরা অবিলম্বে চেয়ারম্যানের অপসারণ এবং এনসিটি ইজারা বাতিলের দাবি জানান।
জবাবে উপদেষ্টা বলেন, আমি আপনাদের সাথে ওয়ান-টু-ওয়ান কথা বলব। আপনাদের কথা শোনা হবে, তবে আপনাদেরও আমার কথা শুনতে হবে। পরে উপদেষ্টার আশ্বাসে আন্দোলনকারীরা শান্ত হন এবং তিনি বন্দর ভবনের বোর্ড রুমে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে জরুরি রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন।
বৈঠক শেষে নৌপরিবহন উপদেষ্টা সাংবাদিকদের জানান, বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে বিদেশি বিনিয়োগ ও চুক্তি প্রয়োজনীয়। তিনি ইঙ্গিত দেন, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী চুক্তি সম্পন্ন হবে এবং এক্ষেত্রে কোনো ধরনের নাশকতা বা অহেতুক বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না। সরকার বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম সচল রাখতে প্রয়োজনে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেবে। এদিকে চলমান অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুক্রবার ও শনিবার স্থগিত করা হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি মানা না হলে পুনরায় কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উপদেষ্টার সাথে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এবং দেশের অর্থনীতির কথা বিবেচনা করে তারা আগামী দুই দিন আন্দোলন স্থগিত থাকবে। তবে যদি এই সময়ের মধ্যে তাদের যৌক্তিক দাবিগুলো (চেয়ারম্যানের অপসারণ ও ইজারা বাতিল) পূরণ না হয়, তবে তারা ফের ২৪ ঘণ্টার কঠোর কর্মসূচিসহ লাগাতার কর্মবিরতিতে নামবেন।
আন্দোলনকারীদের নেতা ও চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, আমরা উপদেষ্টাকে দুই দিনের সময় দিয়েছি। তাই শুক্রবার ও শনিবার আমাদের ২৪ ঘন্টার আন্দোলন স্থগিত করা হয়েছে। আর নির্দিষ্ট সময়ের পর আমাদের দাবী না মানলে ফের আন্দোলন যাবো।
গত বুধবার থেকে শুরু হওয়া এই অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। দেশের মোট রপ্তানির ৯১ শতাংশ এই বন্দর দিয়ে হয়, যা এখন বন্ধ। বহির্নোঙরে জাহাজ আটকে আছে, জেটিতে পণ্য খালাস হচ্ছে না। ১৯টি অফডক থেকে কনটেইনার পরিবহনও বন্ধ। বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী এবং বিজিএমইএ-এর প্রথম সহ-সভাপতি সেলিম রহমান গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সামনে রমজান ও শবে বরাত থাকায় নিত্যপণ্যের সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ সতর্ক করেছেন যে, এই অচলাবস্থা জাতীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বর্তমানে বন্দর এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং ধীরগতিতে কার্যক্রম শুরুর প্রক্রিয়া চলছে।




