নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের আপামর মানুষের মধ্যেই চলছে আপসহীন নেত্রী খ্যাত বেগম জিয়ার শেষ বিদায়ের আলোচনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়িয়ে দিনভর অফিসপাড়া, বাজার-দোকান, অলি-গলি সবখানেই শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে। দলমত নির্বিশেষে বেগম জিয়ার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন, আন্দোলন-সংগ্রাম, কারাবাস, শাসনকালসহ নানা বিষয় উঠে আসছে সর্বজনের আলাপে। মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির উদ্যোগে দলীয় কার্যালয়ে প্রয়াতের আত্মার শান্তি কামনায় কোরআন খতম, দোয়া মাহফিল ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদেও দোয়া-মোনাজাত হয়েছে।
বিশেষ করে সকালে বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিএনপি ও সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনের শোকার্ত নেতাকর্মীরা নগরীর নুর আহমদ সড়কে নাসিমন ভবনের সামনে ভিড় জমাতে শুরু করেন। দলীয় কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলনের পাশাপাশি নেতাকর্মীরা কালো ব্যাজ ধারণ করেন।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি আজীবন দেশের মানুষের ভোটের অধিকার, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য আপসহীন সংগ্রাম করে গেছেন। তিনি দীর্ঘদিন দেশ ও জাতির জন্য নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং গণতন্ত্র, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বেগম খালেদা জিয়া শুধু বিএনপির নেত্রীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তার মৃত্যুতে দেশ একজন মহান অভিভাবক ও অভিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ককে হারাল। তার মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে শোকাহত ও মর্মাহত। মেয়র দেশের সব রাজনৈতিক দল ও সর্বস্তরের জনগণকে এই শোকাবহ সময়ে সংযম, ধৈর্য ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় রাখার আহ্বান জানান।
বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচিত চসিকের সাবেক মেয়র এম মনজুর আলমও শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া একজন আপসহীন দৃঢ়চেতা নেত্রী ছিলেন। তার মৃত্যুতে দেশ ও জাতি একজন দেশপ্রেমিক, মানবতাবাদী, আপসহীন রাজনীতিককে হারাল, যা কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে হেফাজতে ইসলাম। সংগঠনটির আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব সাজেদুর রহমান এক শোকবার্তায় বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে আমরা গভীর শোক প্রকাশ করছি। মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে আমরা মরহুমার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। সেইসঙ্গে তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। বেগম জিয়া ছিলেন একজন সাহসী দেশপ্রেমিক বাংলাদেশি মুসলিম নারী। ২০১৩ সালে আধিপত্যবাদ-প্রযোজিত শাহবাগের ফ্যাসিবাদী ও ইসলামবিদ্বেষী জমায়েতকে তিনি নাস্তিকদের চত্বর আখ্যা দিয়েছিলেন। হেফাজতের ৫ মে’র ঐতিহাসিক ঢাকা অবরোধ কর্মসূচির প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে আলেম-ওলামার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। ইসলামী মূল্যবোধ, দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে তার আপসহীন রাজনৈতিক অবস্থান ও ভূমিকা সবসময় জনগণকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। মৃত্যুর আগে তিনি পুরো জাতির অবিসংবাদিত রাজনৈতিক অভিভাবকে পরিণত হয়েছিলেন। তারা বলেন, ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে বেগম জিয়ার সুদীর্ঘ আন্দোলন ও অপরিসীম ত্যাগ-তিতিক্ষা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। আমরা আশা করি, বর্তমান বিএনপি বেগম জিয়ার সেই আধিপত্যবাদবিরোধী ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আদর্শ ধারণ করে বাংলাদেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে আপসহীন রাজনীতি অব্যাহত রাখবে।
চসিক পরিচালিত প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এস এম নছরুল কদির সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। শোকবার্তায় তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া একজন অনন্য রাজনীতিক ও দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি নিজের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক আন্দোলন, জনগণের অধিকারের দাবি ও রাজনৈতিক জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। শিক্ষা, রাজনীতি, নারী নেতৃত্ব ও সামাজিক সংগঠনে বেগম খালেদা জিয়ার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার নেতৃত্বের ধারা এবং সংগ্রাম-সংস্কৃতির ঐতিহ্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবে।
এছাড়া প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মোহীত উল আলম, আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. মোরশেদ মাহমুদ খান, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের সহযোগী ডিন অধ্যাপক এম. মঈনুল হক, প্রকৌশল অনুষদের সহযোগী ডিন অধ্যাপক ড. সাহীদ মো. আসিফ ইকবাল, রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ ইফতেখার মনির, আইন অনুষদের সহকারী ডিন তানজিনা আলম চৌধুরী, সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সহকারী ডিন ফারজানা ইয়াসমিন চৌধুরী শোক প্রকাশ করেছেন।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহমুদ আব্দুল মতিন ভূঁইয়া এক শোকবার্তায় বলেন, বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিত্ব। গণতন্ত্রের বিকাশ, সাংবিধানিক ধারার সংরক্ষণ এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তার ভূমিকা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার ইন্তেকালে দেশ একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতৃত্বকে হারাল, যা জাতীয় জীবনে এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করেছে।
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান শোকবার্তায় বলেন, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশ ও জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হলো। বাংলাদেশে গণতন্ত্র, বহুদলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন বাংলাদেশের সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। দেশ ও জাতির প্রতি তার অবদান জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। দেশের শিক্ষাক্ষেত্রেও অভূতপূর্ব অবদান রেখেছেন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি মেয়েদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালু করেন, যা বাংলাদেশের নারী শিক্ষার অগ্রগতির ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক।
বেসরকারি সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান, উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক সরওয়ার জাহান, উপাচার্য ড. শরীফ আশরাফউজ্জামান, শোকবার্তায় বলেন, দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে আপসহীন নেত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে এবং দেশ গঠনে অসামান্য ভূমিকা রাখায় জাতি তাকে চিরদিন মনে রাখবে।
সাংবাদিক সংগঠনগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিইউজে), চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিএমইউজ) এবং টিভি ক্যামেরা জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (টিসিজেএ) শোক জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।
সিইউজের সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক সবুর শুভ শোকবার্তায় বলেন, বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক অবিস্মরণী ও দৃঢ়চেতা নেতৃত্ব। রাষ্ট্র পরিচালনা, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বহুদলীয় রাজনীতির বিকাশে তার অবদান ইতিহাসে অসামান্য। একজন সাহসী ও আপসহীন রাজনৈতিক চরিত্র হিসেবে তিনি দেশের মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে আজন্ম সংগ্রামী নেত্রী। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানসহ দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক রূপান্তরে তিনি এক অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার মৃত্যুতে জাতি এক অভিভাবকসুলভ নেতৃত্বকে হারাল।
শোক বিবৃতিতে সিএমইউজের সভাপতি মোহাম্মদ শাহনওয়াজ ও সাধারণ সম্পাদক সালেহ নোমান বলেন, বহু উত্থান‑পতনের মধ্য দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, আধিপত্যবাদ বিরোধী লড়াই, সংসদীয় রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় তার ভূমিকা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি ছিলেন জাতীয় ঐক্যের প্রতীক ও বাংলাদেশের গণতান্ত্রকি রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশের রাজনীতিতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। এ শোক শুধু একটি দলের নয়—সমগ্র জাতির। দেশে মুক্ত গণমাধম্যের চর্চায় বেগম খালেদা জিয়ার অবদান কৃতজ্ঞচিত্রে স্মরণ করছে সিএমইউজে।টিসিজেএ, চট্টগ্রামের নির্বাহী কমিটির সভাপতি শফিক আহমেদ সাজীব, সহ-সভাপতি মোহাম্মদ আলী আকবর, সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল আলম চৌধুরী মামুন, সহ-সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলমগীর, অর্থ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক বাসু দেব, দফতর সম্পাদক পারভেজ রহমান, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সাইমুন আল মুরাদ, নির্বাহী সদস্য নুর হাসিব ইফরাজ, সাইফুল ইসলাম ও রবিউল হোসেন গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
প্রসঙ্গত,সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মঙ্গলবার সকাল ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।





