অনলাইন ডেস্ক : বিশ্বজুড়ে জ্বলানি সংকটের মধ্যেও দেশে গ্যাসের সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে আগামী এপ্রিল মাসের নয়টি এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) কার্গো কিনবে সরকার। এসব কার্গোর মধ্যে আটটি কেনা হবে স্পট মার্কেট থেকে। আর বাকি একটি কাতারএনার্জি ট্রেডিংয়ের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় অ্যাঙ্গোলা থেকে আসবে। এসব এলএনজি আমদানিতে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি বাড়তে পারে বলে জানা গেছে।রাজস্বের ওপর চাপ বাড়লেও এপ্রিল মাসের জন্য এসব কার্গো নিশ্চিত করতে সরকার অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে। যদিও মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর আগে ১১টি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা ছিল সরকারের; সে তুলনায় এখন ২টি কার্গো কম আসছে।স্পট মার্কেট থেকে কার্গোগুলো গড়ে প্রায় ২২ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ দরে কেনা হচ্ছে—যা যুদ্ধের আগে প্রতি এমএমবিটিইউ ৯ থেকে ১০ ডলারের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।কর্মকর্তারা বলছেন, এ ব্যয় বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য।
চলতি অর্থবছর ২০২৫-২৬-এর জন্য বরাদ্দকৃত ৬ হাজার কোটি টাকার প্রায় সমান এই ভর্তুকি বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি কেনা। মার্চের শুরু থেকে চুক্তিবদ্ধ পাঁচটি সরবরাহকারীই ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করায় দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, ফলে সরকারকে ব্যয়বহুল স্পট মার্কেটের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার হিসাবে, চলতি অর্থবছরের শেষ তিন মাস—এপ্রিল থেকে জুন—পর্যন্ত অতিরিক্ত প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হবে, যা মূলত ওই ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বাইরে। এর বড় অংশই ব্যয় হবে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানিতে।পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) একেএম মিজানুর রহমান বলেন, ‘উচ্চমূল্য হলেও এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। স্পট মার্কেট থেকে কেনার কারণে শুধু এপ্রিল মাসেই অতিরিক্ত প্রায় ৪,৫০০ কোটি টাকা ব্যয় বেড়েছে।’তিনি আরও বলেন, ‘এই অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ভর্তুকির আর্থিক চাপ থাকা সত্ত্বেও আমরা গ্যাস সরবরাহ সচল রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’স্পট মার্কেটই একমাত্র ভরসা
সংঘাত তীব্র হওয়ার আগে এপ্রিল মাসে ১১টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা ছিল পেট্রোবাংলার। এর মধ্যে আটটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এবং তিনটি স্পট মার্কেট থেকে আনার কথা ছিল।তবে চুক্তিভিত্তিক সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় সেই পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পর কাতারএনার্জি, ওমানের ওকিউটি ট্রেডিং এবং এক্সেলারেট এনার্জিসহ বড় সরবরাহকারীরা ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করে। এর ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, বাংলাদেশের এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থা সরাসরি বা সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারীদের মাধ্যমে কাতারএনার্জির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।মিজানুর রহমান বলেন, ‘কাতারএনার্জির কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।’তিনি আরো বলেন, ‘কাতারএনার্জি পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন শুরু না করা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ নৌপরিবহন স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত চুক্তিভিত্তিক এলএনজি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে।’
ব্যয় বাড়ছে
স্পট মার্কেট ও দীর্ঘমেয়াদি এলএনজির দামের মধ্যে এখনও বড় ব্যবধান রয়েছে। বর্তমানে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ প্রায় ২২ ডলার। আর এপ্রিলের একমাত্র দীর্ঘমেয়াদি কার্গোর দাম ধরা হচ্ছে প্রতি এমএমবিটিইউ ১০ থেকে ১১ ডলারের মধ্যে—যা ব্রেন্ট ক্রুডের গত তিন মাসের গড় মূল্য ও প্রযোজ্য অতিরিক্ত খরচের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, স্পট কার্গোর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে এলএনজির দামের তীব্র ঊর্ধ্বগতির কারণে অতিরিক্ত প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ভর্তুকির চাপ তৈরি হয়েছে।মিজানুর রহমান বলেন, ‘এপ্রিলের জন্য এলএনজি কার্গো পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এখন মে ও জুন মাসের জন্য সরবরাহ নিশ্চিত করার কাজ চলছে।’
গ্যাস সরবরাহ স্থিতিশীল থাকার আশা
চলমান সরবরাহ সংকটের মধ্যেও এপ্রিলে গ্যাস সরবরাহ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা পেট্রোবাংলার। এ সময় দৈনিক ২ হাজার ৫৭০ থেকে ২ হাজার ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এই সরবরাহ নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৭৫০ এমএমসিএফডি এবং এলএনজির মাধ্যমে অতিরিক্ত ৮৭০ থেকে ৮৯২ এমএমসিএফডি গ্যাস পাওয়া যাবে।
এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ দেওয়া হবে প্রায় ৮২৫ থেকে ৮৫০ এমএমসিএফডি গ্যাস— যা দিয়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সর্বোচ্চ প্রায় ৪,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।
অবশিষ্ট গ্যাস শিল্প খাত, সার কারখানা ও গৃহস্থালি খাতে বিতরণ করা হবে; তবে এক্ষেত্রে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পখাতকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।সূত্র: বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড





