অনলাইন ডেস্ক: ভোটের রাতে ঝালকাঠির আকাশে কোনো আতশবাজি ফোটেনি। কিন্তু নলছিটি থেকে ঝালকাঠি জেলা সদর পর্যন্ত বাতাসে ছিল অন্যরকম এক উচ্ছ্বাস। ভোটের হিসাব মেলাতেই স্পষ্ট হয়ে যায় তার বিজয়। বিএনপির বিজয়ী এই প্রার্থী হলেন ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো।ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল বিভাগের ২১টি আসনে ১২৪ জন প্রার্থীর মধ্যে একমাত্র নারী হিসেবে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়েছেন তিনি। এর আগেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আমির হোসেন আমুকে পরাজিত করেছিলেন।ঝালকাঠি জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. মমিন উদ্দিন বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) রাতে ভোটগণনা শেষে বেসরকারিভাবে ফল ঘোষণা করেন। ঘোষিত ফল অনুযায়ী, ঝালকাঠি-২ (সদর-নলছিটি) আসনে ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো পেয়েছেন ১ লাখ ১৩ হাজার ১০০ ভোট।তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী এস এম নেয়ামুল করিম দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৮০৫ ভোট।
সংখ্যার ভিড়ে একা নারী
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, বরিশাল বিভাগের ২১টি সংসদীয় আসনে মোট প্রার্থী ছিলেন ১২৪ জন। তাদের মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন মাত্র দুজন, যা শতকরা দুই ভাগেরও কম। এই দুজনের একজন ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো।অন্যজন বরিশাল-৫ আসনে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মনোনীত ও গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট সমর্থিত প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তী।
এদিকে, ঝালকাঠি-১ আসনে তরুণদের রাজনৈতিক সংগঠন এনসিপির প্রার্থী হিসেবে ডা. মাহমুদা আলম মিতু মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। জোটগত সিদ্ধান্তের কারণে পরে তিনি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। তার আগেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভোটের প্রচারণায় তিনি শুধু ঝালকাঠী কিংবা বরিশাল নয়, সারা দেশে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন।গরিবের ডাক্তার হিসেবে পরিচিত মনীষা চক্রবর্ত্তী প্রচারণার শুরুতেই বেশ সাড়া ফেলেছিলেন।
কিন্তু তার বরিশাল-৫ আসনে ভোটের ফল ছিল ভিন্ন। সেখানে বিএনপির মজিবর রহমান সরোয়ার পেয়েছেন এক লাখ ৩৫ হাজার ১৪৬ ভোট এবং ইসলামী আন্দোলনের মুফতি ফয়জুল করীম পেয়েছেন ৯৫ হাজার ৪৪ ভোট। আর বাসদের প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তী পেয়েছেন ২২ হাজার ৪৮৬ ভোট।
নামের সঙ্গে ইতিহাস
ঝালকাঠি অঞ্চলে তিনি পরিচিত ‘ইলেন ভুট্টো’ নামেই। তাঁর প্রয়াত স্বামী জুলফিকার আলী ভুট্টো একসময় জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। পরে এরশাদের আহ্বানে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে তিনি ঝালকাঠি-২ আসনে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
স্বামীর মৃত্যুর পর ২০০০ সালের উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হয়ে ইলেন ভুট্টো আওয়ামী লীগের আমির হোসেন আমুর কাছে পরাজিত হন। তবে এক বছরের মধ্যেই, ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে সেই আমুকেই হারিয়ে প্রথমবার সংসদ সদস্য হন তিনি। দীর্ঘ বিরতির পর এবারের জয় যেন সেই পুরনো গল্পেরই নতুন অধ্যায়।ঝালকাঠি জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টোকে মনোনীত করেন। তবে তাঁর নির্বাচনী পথ মোটেও সহজ ছিল না। জেলা পর্যায়ের কয়েকজন মনোনয়নবঞ্চিত নেতার বিরোধিতার কারণে ভোটের আগে দলের কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছিল। সেই বিভ্রান্তি কাটিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতেই জয় নিশ্চিত হয়।
কৃতজ্ঞতার ভাষা
ফল ঘোষণার পর ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো সাংবাদিকদের বলেন, ঝালকাঠি সদর ও নলছিটির মানুষ তাঁকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছেন। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ তিনি। একই সঙ্গে বিএনপির নেতৃত্ব তাঁর প্রতি যে আস্থা রেখেছে, তার প্রতিদান দিতে পেরেছেন বলেও মনে করেন। আগামী দিনে এলাকার উন্নয়নই হবে তাঁর প্রধান লক্ষ্য।
সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের সাবেক অধ্যাপক ও নারী নেত্রী শাহ সাজেদা বলেন, সংখ্যার বিচারে এটি একটি আসনের ফল। কিন্তু প্রতীকের বাইরে দাঁড়িয়ে দেখলে, এই জয় বরিশাল অঞ্চলের রাজনীতিতে নারী উপস্থিতির এক বিরল চিহ্ন। ২১টি আসনের ভিড়ে তিনি একাই বিজয়ী হলেও, সেই জয় জায়গা করে নেবে ইতিহাসের পাতায়।




