অনলাইন ডেস্ক:চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি অপারেটরের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে উত্তাল বন্দর এলাকা। আজ মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে শ্রমিক-কর্মচারীদের ২৪ ঘণ্টার টানা কর্মবিরতিতে কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের প্রধান এই সমুদ্র বন্দরে। মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে বন্দরে গিয়ে দেখা যায়, একদিকে যেমন বন্দরে জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানামা বন্ধ রয়েছে, অন্যদিকে বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোগুলোতে (অফডক) জমেছে রপ্তানি পণ্যের পাহাড়। দ্রুত এই সংকটের সমাধান না হলে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।এর আগে গত শনিবার (৩১ জানুয়ারি) থেকে টানা তিন দিন আংশিক কর্মবিরতি পালনের পর আজ মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টা আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নেন শ্রমিক কর্মচারীরা।
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সকালে কিছু সময় চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও এনসিটি টার্মিনালের জেটিগুলোতে পণ্য ওঠানামার কাজ চলছিল। তবে সকাল পৌনে ১০টার দিকে আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভ শুরু করার পর থেকে বন্দরের ইয়ার্ড থেকে আমদানি করা পণ্য ও কনটেইনার সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এনসিটি টার্মিনাল বর্তমানে পরিচালনা করছে চট্টগ্রাম ড্রাইডক লিমিটেড (সিডিডিএল)।এদিকে, কনটেইনার চলাচল নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত কম্পিউটারাইজড টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম (টিওএস) পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত বন্দর কর্মচারীরা কাজ বন্ধ রেখেছেন বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা ঐক্য পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, শ্রমিক ও কর্মচারীরা ধীরে ধীরে ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতিতে যোগ দিচ্ছেন।
বন্দর দিয়ে রপ্তানি হওয়া কনটেইনারগুলোর সিংহভাগ ব্যবস্থাপনা করে চট্টগ্রামের ১৯টি বেসরকারি ডিপো। ধর্মঘটের কারণে ডিপো থেকে বন্দরে রপ্তানি কনটেইনার পাঠানো পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
কর্মবিরতি শুরুর আগে ডিপোগুলোতে প্রায় আট হাজার একক রপ্তানিমুখী কনটেইনার জাহাজীকরণের অপেক্ষায় ছিল। গত তিন দিনে সেই সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় হাজারখানেক বাড়তি কনটেইনারের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে ডিপোগুলোতে।
বেসরকারি কনটেইনার ডিপো সমিতি (বিকডা)’র মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, আমরা রপ্তানি কনটেইনারের মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ সরবরাহ করতে পারছি। ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতি চললে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে।এই জট সামাল দিতে অন্তত এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগবে।শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলনের কারণে বন্দরের সবচেয়ে পুরনো জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) টার্মিনালের জেটিগুলোতে পণ্য ওঠানামা আজ (মঙ্গলবার) সকাল থেকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া এনসিটি ও সিসিটি টার্মিনালেও বিক্ষোভের কারণে কার্যক্রম অচল রয়েছে। বর্তমানে বন্দরে প্রায় ৩২ হাজার ১০০ টিইইউস (২০ ফুট লম্বা কনটেইনারের একক) কনটেইনার এবং ৯৭টি জাহাজ অবস্থান করছে। কনটেইনার কিপডাউন ও ডেলিভারি বন্ধ থাকায় বন্দরের ভেতরেও তীব্র জট সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।শিপিং লাইনগুলোর দাবি, প্রতিটি জাহাজ জেটিতে অলস বসে থাকায় প্রতিদিন বার্থ হায়ার ও ফুয়েল খরচসহ মোটা অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে। এমএসসি শিপিংয়ের হেড অব অপারেশন আজমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, বিদেশি অপারেটরদের কাছে বন্দর নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর।
তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ-র পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, কাঁচামাল সময়মতো কারখানায় না পৌঁছালে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। সামনে রমজান ও ২১ শে ফেব্রুয়ারির ছুটি রয়েছে। দ্রুত বন্দর সচল না করলে এই ক্ষতি সামলানো অসম্ভব হবে। তবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক বলেন, কনটেইনার কিপডাউন চলছে, আমাদের লোকবল সব জায়গায় কাজ করছে। বন্দর ব্যবহারকারী এবং যারা ডেলিভারি নেবে; বিশেষ করে সিঅ্যান্ডএফদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন তারা তাদের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করেন। কেউ যেন গুজবে কান না দেন এবং বাইরে থেকে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল রমজানকে সামনে রেখে বা ভোগ্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে এই পরিস্থিতি কাজে লাগাতে না পারে, সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।
এদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর ব্যানারে এই আন্দোলন চলছে। আন্দোলন দমাতে কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে ২০ জন কর্মচারীকে শাস্তিমূলক বদলি করলেও শ্রমিকরা তা প্রত্যাখান করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, ইজারা বাতিল ও বদলি আদেশ প্রত্যাহার না হলে আরো কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।
নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো কাজ করা হবে না এবং চুক্তিটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে এই অনিশ্চয়তার মধ্যে দেশের ৯৩ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণকারী চট্টগ্রাম বন্দরের ভবিষ্যৎ নিয়ে পুরো দেশ উদ্বিগ্ন।




