৩রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

শবেবরাতের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল

মুফতি সাইফুল ইসলাম : ইসলামের দৃষ্টিতে কিছু রাত এমন আছে, যেগুলো আত্মশুদ্ধি, তওবা ও আল্লাহর দিকে ফিরে আসার বিশেষ সুযোগ নিয়ে আসে। শাবান মাসের মধ্যভাগের রাত, যা আমাদের সমাজে শবেবরাত নামে পরিচিত, তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ রাতকে কেন্দ্র করে আবেগ যেমন আছে, তেমনি রয়েছে কিছু বিভ্রান্তি ও অতিরঞ্জনও। তাই এ রাতের আমল কী হবে এবং কী হবে না—সে বিষয়ে কোরআন-হাদিস ও নির্ভরযোগ্য আলেমদের বক্তব্যের আলোকে বিষয়টি বোঝা জরুরি।আলা ইবনুল হারিস (রহ.) থেকে বর্ণিত, আয়েশা (রা.) বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে নামাজে দাঁড়ান এবং এত দীর্ঘ সিজদা করেন যে, আমার ধারণা হলো, তিনি হয়তো মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি তখন উঠে তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম। তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ল। যখন তিনি সিজদা থেকে উঠলেন এবং নামাজ শেষ করলেন, আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘হে আয়েশা’ অথবা বলেছেন, ‘হে হুমাইরা, তোমার কি এই আশঙ্কা হয়েছিল যে, আল্লাহর রাসুল তোমার হক নষ্ট করবেন?’ আমি উত্তরে বললাম, না, ইয়া রাসুলাল্লাহ।
আপনার দীর্ঘ সিজদা থেকে আমার এই আশঙ্কা হয়েছিল, আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন কি না। নবীজী জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি জানো, এটা কোন্ রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন ইরশাদ করলেন―
এটা হলো অর্ধ-শাবানের রাত (শাবানের চৌদ্দ তারিখের দিনগত রাত)। আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শাবানের রাতে তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেন এবং ক্ষমপ্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন এবং অনুগ্রহ প্রার্থীদের অনুগ্রহ করেন আর বিদ্বেষপোষণকারীদের ছেড়ে দেন তাদের অবস্থাতেই।
(শুআবুল ঈমান, বাইহাকী ৩/৩৮২-৩৮৬)
এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দীর্ঘ নফল নামাজ এবং দীর্ঘ সিজদার বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে। এটি প্রমাণ করে যে, ফজিলতপূর্ণ রাতে নফল ইবাদতে মনোনিবেশ করা শরিয়তসম্মত ও প্রশংসনীয় আমল। সুতরাং শবে বরাতের রাতেও নফল নামাজসহ অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগির প্রতি যত্নবান হওয়া কাম্য।
নফল নামাজ আদায় করা, (নফল নামাজের ক্ষেত্রে সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি হলো; দুই রাকাত করে যত রাকাত সম্ভব নামাজ আদায় করা। এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বা নির্দিষ্ট সূরা নির্ধারিত নয়)
কোরআনুল কারিম তিলাওয়াত,
দরুদ শরিফ পাঠ,
তওবা-ইস্তেগফার ও দোয়ায় মনোযোগ দেওয়া।
সম্ভব হলে সালাতুস তাসবিহ আদায় করা।
শরীরের প্রয়োজন হলে কিছুটা ঘুম নেওয়াও দোষের নয়। তবে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে, যেন সারা রাতের ইবাদতের ক্লান্তিতে ফজরের ফরয নামাজ জামাআতের সঙ্গে আদায় করা থেকে বঞ্চিত না হতে হয়। কারণ ফরজ ইবাদতের গুরুত্ব সব অবস্থায় নফল ইবাদতের চেয়ে বেশি।
এ প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা স্মরণ রাখা প্রয়োজন। অনেক অনির্ভরযোগ্য ওজিফার বই-পুস্তকে শবে বরাতের নামাজের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন উল্লেখ করা হয়—যেমন নির্দিষ্ট রাকাত সংখ্যা, প্রতি রাকাতে নির্দিষ্ট সূরা নির্দিষ্টবার পড়া ইত্যাদি। এসবের কোনো সহিহ দলিল নেই। বরং এগুলো থেকে বিরত থাকাই উচিত। স্বাভাবিকভাবে যেকোনো সূরা দিয়ে দুই রাকাত করে নফল নামাজ আদায় করাই সঠিক পদ্ধতি। (দ্রষ্টব্য: আল-আছারুল মারফূআ, আবদুল হাই লাখনোভী, পৃ. ৮০–৮৫)

আরও পড়ুন