অনরাইন ডেস্ক: নীলফামারীর সৈয়দপুর শাখা অগ্রণী ব্যাংক থেকে সহকর্মীদের আইডি-পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা তুলে আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে একই শাখার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আলিমুল আল রাজি তমালের বিরুদ্ধে। গত ১৫ জানুয়ারি থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত তিনি। এ ঘটনায় সাত সদস্য সমন্বয়ে গঠিত একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন ব্যাংকটির মহাব্যবস্থাপক (অডিট)-এর কাছে।২০২৩ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত আরটিজিএস ও বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই টাকা (৪২ কোটি ৮৫ লাখ ৬৮ হাজার ৬২২ টাকা) আত্মসাৎ করার সত্যতা পাওয়া গেছে বলে জানায় কমিটি। এ ছাড়া প্রতারণা ও জালিয়াতির সঙ্গে ব্যাংকটির সৈয়দপুর, নীলফামারী, জলঢাকা ও রংপুর আঞ্চলিক অফিসের আরো ১৮ কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করে কমিটি।তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছিল সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মেহেদী রহমান। অন্য ছয় সদস্য হলেন এসপিও মো. আনোয়ারুজ্জামান ও খালেদ মোহাম্মদ সাইফুদ্দীন, প্রিন্সিপ্যাল অফিসার কাজী মোহাম্মদ সোলায়মান হোসেন, দেবাশীষ মল্লিক, মো. ইকবাল কবীর ও এ কে এম ফজলুল করিমকে।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৭ জুলাই অগ্রণী ব্যাংকের সৈয়দপুর শাখায় সিনিয়র অফিসার হিসেবে যোগ দেন আলিমুল আল রাজি তমাল। গত ১ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি ওই শাখায় কর্মরত ছিলেন। এ সময় তিনি মোট সিএনজি লেজারে ১৩২ কোটি ২৬ লাখ ২২ হাজার ৯৮১ টাকার লেনদেন (ডেবিট ও ক্রেডিট উভয়ই) প্রস্তুত করেন এবং হিসাব মিলিয়ে রাখেন, যা সম্পূর্ণ ভুয়া। ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩০ কোটি এবং সাত কোটি সাত লাখ ৩৪ হাজার ৮১১ টাকা সিএনজি লেজারভুক্ত করেন।
একই বছরের ৪ ডিসেম্বর পাঁচ কোটি ৭৮ লাখ ৩৪ হাজার ৮১১ টাকার একটি আইবিডিএ-এর বিপরীতে পাঁচটি চেক সংগ্রহ করলেও আইবিডিএটি রেসপন্ড না করে নিজের ড্রয়ারে ফেলে রাখেন তমাল। ফলে দুইটি অসন্বিত পোস্টিং-এ ৩০ কোটি এবং একটি আইসিডি-এ পাঁচ কোটি ৭৮ লাখ ৩৪ হাজার ৮১১ টাকাসহ মোট ৪২ কোটি ৮৫ লাখ ৬৯ হাজার ৬২২ টাকা আত্মসাত করেন।
রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে ২০২৪ সালের ৭ মার্চ, ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রæয়ারি, একই সালের ১৪ মে ও ৯ সেপ্টেম্বর পৃথক চারটি পরিদর্শন হয় ওই শাখায়। এর পরও এত বড় জালিয়াতি ধরা না পাড়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেন ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা।শুধু তাই নয়, পরিদর্শন করা হলেও পরিদর্শন প্রতিবেদনে অঞ্চল প্রধানের স্বাক্ষর পাওয়া যায়।
পরিদর্শন প্রতিবেদনে আরো দুইজন কর্মকর্তার কথা উল্লেখ থাকলেও তার ইনিশিয়াল স্বাক্ষর ছাড়া অন্য কোনো পরিচয় পাওয়া যায়নি।
তদন্ত কমিটি বলছে, অবহেলা, তদারকি না করে এই জালিয়াতির সহায়তা করেছেন সৈয়দপুর শাখার এসপিও মো. মনিরুজ্জামান, গাইবান্ধা শাখার এসপিও মো. হেলাল উদ্দিন খান, সৈয়দপুর শাখার পিও মো. জায়েম, নীলফামারী শাখার এসও আব্দুল খালেক সরকার, সৈয়দপুর শাখার সিনিয়র অফিসার শাহনাজ বেগম, সৈয়দপুর শাখার অফিসার (ক্যাশ) তমাল চন্দ্র রায়, সৈয়দপুর শাখার সিনিয়র অফিসার (অব.) আব্দুল ওয়াজেদ সরকার, নীলফামারী শাখার সিনিয়র অফিসার তাইজুল ইসলাম, সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মো. আব্দুল লতিফ, অফিসার (ক্যাশ) মো. মাইদুল ইসলাম, সিনিয়র অফিসার মো. আমিরুল ইসলাম, এসও মো. আক্তারুজ্জামান, প্রিন্সিপ্যাল অফিসার মো. রেজাউল করিম, প্রিন্সিপ্যাল অফিসার সঞ্জয় কুমার রায়, সিনিয়র অফিসার মোছা. হাবিবা খাতুন, সিনিয়র অফিসার কাজী রায়হানুজ্জামান হক ও অফিসার জাকিয়া আক্তার।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযুক্ত তমাল রংপুর বাস টার্মিনাল এলাকার ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো শাখার একটি হিসাব থেকে ১৫ কোটি ২৯ লাখ ১২ হাজার ৮৬৪ টাকা টাকা সরিয়েছেন। এছাড়া যে কয়টি ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে তমাল টাকা সরিয়েছেন, তার মধ্যে নিলুফার আক্তার ও রোদেলা আক্তারের নামে খোলা সুপার সেভিংস হিসাব উল্লেখযোগ্য। নিলুফার আক্তারের হিসাবে আরটিজিএসের মাধ্যমে সাত কোটি ২৭ লাখ টাকা এবং রোদেলা আক্তারের হিসাবে চার কোটি ৫০ লাখ টাকা পাঠানো হয়। তমাল নিজের সুপার সেভিংস হিসাবে প্রায় ৯ কোটি ৮৫ লাখ ৭২ হাজার ১৪২ টাকা, তার অন্য আরেকটি একাউন্ট থেকে ৯ লাখ ৯২ হাজার ৫০ টাকা, তার বড় ছেলের নামে খোলা ‘তৌহিদ ডেইরি খামার’-এর চলতি হিসাবে ৩৩ লাখ ৯ হাজার ৩ ৩১ টাকা আত্মসাত করা হয়েছে। এছাড়া তমালের সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত আবদুল লতিফের শ্যালক মেহেদী হাসানের প্রতিষ্ঠান ‘মননুজান ট্রেডার্স’-এর হিসাবে আত্মসাত করা হয়েছে প্রায় ৪০ লাখ, আব্দুল লতিফের নিজের একাউন্টে ৪৫ লাখ, কালেকশন একাউন্টে ১০ লাখ, রেজাউল করিম নামের এক ব্যক্তির পৃথক দুটি একাউন্টে ১১ লাখ এবং অন্য আরেকটি একাউন্ট থেকে ৬৯ হাজার ৯৭১ টাকা।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই জালিয়াতিতে তমালকে সহযোগিতা করেছেন ওই শাখার সাবেক ম্যানেজার আবদুল লতিফ। অভিযোগ রয়েছে, সহায়তার বিনিময়ে তিনি ৪৫ লাখ টাকা নিয়েছেন। তবে আবদুল লতিফ দাবি করেন, এটি আমার পাওনা টাকা ছিল এবং নিয়ম মেনেই লেনদেন করা হয়েছে।
অন্যদিকে, কোনো ভাউচার বা চেক-রশিদ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হলেও বিষয়টি নজরে আনতে পারেননি শাখাটির সাবেক ব্যবস্থাপক মো. মনিরুজ্জামান। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দায় চাপান ব্যাংকের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আইটি বিভাগের ওপর। তার দাবি, অতিরিক্ত আরটিজিএস লেনদেন হলেও আইটি টিম তাকে এ বিষয়ে সহায়তা বা অবহিত করেনি।
জানা গেছে, ব্যাংকের শাখাগুলোর তদারকি করে জোনাল অফিস ও জেনারেল ম্যানেজারের কার্যালয়। গত এক বছরে সৈয়দপুর শাখায় চারবার নিরীক্ষা হলেও এত বড় জালিয়াতি ধরা পড়েনি।এ ব্যাপারে অগ্রণী ব্যাংকের রংপুর জোনাল ম্যানেজার জহির রায়হান বলেন, আমাদের জনবল খুবই সীমিত এবং আইটিতে দক্ষ জনবলও নেই। তিন মাস পরপর স্যাম্পলিং ভিত্তিতে পরিদর্শন করা হয়। তাই বিষয়টি ধরা পড়েনি।সৈয়দপুর শাখার বর্তমান ব্যবস্থাপক মশিউর রহমান বলেন, আমি মাত্র এক মাস আগে দায়িত্ব নিয়েছি। বিষয়টি তদন্তাধীন। তদন্ত শেষ হলে বিস্তারিত জানা যাবে।রংপুর জোনের জেনারেল ম্যানেজার সুধীর রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, শাখায় গিয়ে চেক-ভাউচার যাচাই করা জিএমের কাজ নয়। এটি শাখা ব্যবস্থাপক ও জোনাল অফিসের দায়িত্ব। তবে এখানে আইটির দায় থাকতে পারে।
অগ্রণী ব্যাংকের রংপুর অঞ্চলের আইন উপদেষ্টা অ্যাড. আসাদুজ্জামান রিনো বলেন, এই ঘটনায় শাখা ব্যবস্থাপকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং আইটি বিভাগের দায় রয়েছে। কেউ দায় এড়াতে পারবেন না। তবে আত্মসাৎ করা অর্থ পুরোপুরি উদ্ধার করা সম্ভব হবে কিনা, সে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।
এদিকে, প্রধান অভিযুক্ত তমালের সন্ধানে রংপুর শহরের রহমতপুরের বর্তমান ঠিকানা এবং নীলফামারী সদরের কাঞ্চনপাড়া এলাকার স্থায়ী ঠিকানায় গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তার কয়েকজন সহকর্মী ও স্বজন জানান, বাবা, স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে তিনি বর্তমানে দুবাইয়ে অবস্থান করছেন।
গত ১৫ জানুয়ারি থেকে অফিসে অনুপস্থিত তমাল। এ ঘটনায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে। বিষয়টি পুলিশ থেকে রংপুর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কার্যালয়কে জানানো হয়েছে। পরে মামলা করার অনুমতি চেয়ে ঢাকায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে আবেদন করেছে রংপুর অফিস।
তমালের ছোট ভাই তুহিন সালেহীন জানান, তিনি (তমাল) দুবাই গেছেন কিনা, তা নিশ্চিত নই। তবে আগে পরিবারসহ কয়েকবার দুবাই গিয়েছিলেন। সেখানে তার সবজি ও লোকজন পাঠানোর ব্যবসা রয়েছে।ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আনোয়ারুল ইসলাম জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করার প্রক্রিয়া চলছে।




