অনলাইন ডেস্ক: ভোট নিয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই বংশপরম্পরায় প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করা মুণ্ডা সম্প্রদায়ের মানুষের। সুন্দরবনের কোলঘেঁষা এলাকায় বসবাসকারী এই নৃগোষ্ঠীর নিত্যসঙ্গী নোনা পানি আর কাদামাটি। সারা দেশে যখন ভোটযুদ্ধ চলছে, তখন বন আর নদীর ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা বাসিন্দাদের মধ্যে সেই চিরচেনা একই দৃশ্য, দুবেলা দুমুঠো ভাতের জন্য যুদ্ধ।ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে সোমবার সাতক্ষীরার সুন্দরবন লাগোয়া উপজেলা শ্যামনগরের মুণ্ডা সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের।এ সময় উপজেলার কলবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা কাদম্বিনি মুণ্ডা (৫০) বলেন, ‘ভোট দেই লাইনে দাঁড়িয়ে, কিন্তু আমাদের ভাগ্য তো দাঁড়ায় না। নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা গ্রামে এসে বলেন, বেড়িবাঁধ ঠিক করে দেব, শিশুদের লেখাপড়ার পরিবেশ ভালো করে দেব, রাস্তা করে দেব, বিনামূল্যে ওষুধ দেব, সুপেয় পানি দেব, চাল-ডাল কত কিছু দিতে চায়।’ তিনি বলেন, ‘ভোটের পর আমরা শুধু ভোটসংখ্যা, যে লাউ সেই কদু। তবে এবার বুঝেশুনে ভোট দেব।যে প্রার্থী আমাদের দুঃখ-সুখের কথা শুনবে, আমরা তাকেই ভোট দেব।’ শ্যামনগর এলাকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মুণ্ডা সম্প্রদায়ের নেতা আসিত মুণ্ডা বলেন, ‘ভোটের দিন চারদিকে উৎসবের আমেজ থাকে। আমরাও দলবেঁধে রং-বেরঙের পোশাক পরে ভোট দিতে যাই, কিন্তু জীবনের রং তো বদল হয় না। ভোটের পর চারিদিকে থেমে যায় ভোটের কোলাহল।ব্যানার ফেস্টুন পুরনো হয়। সেই সঙ্গে আমাদের দাবিগুলোও যেন মিলিয়ে যায় বাতাসে।’
আসিত মুণ্ডা আরো বলেন, প্রতিবারই প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির সঙ্গে থেকে যায় ঢের ফারাক। তাই এবারের ভোট নিয়ে মুণ্ডা সম্প্রদায়ের মধ্যে তেমন কোনো মাতামাতি নেই। তিনি বলেন, ভোট নিয়ে কিছু হলেই ক্ষতিগ্রস্ত হই আমরা, সংখ্যালঘুরা।নানা ধরনের হয়রানি। হামলা-মামলা অগ্নিসংযোগ; নারী ও শিশুরা অনিরাপদ হয়ে পড়ে।কথার ফাঁকে আসিত মুণ্ডার বলেন, সবাই এবার ভোট দিতে যাবে। এবার দুই ব্যালটে ভোট হবে। এমপির ব্যালটের সাথে গণভোটের ব্যালটও থাকবে। দেখা যাক এবার ভোটে পাশ করে নেতারা আদিবাসীদের জন্য কি করে। তবে আমাদের আশা, এবার নতুন সরকার এলে নাগরিক হিসেবে আমরা মর্যাদার সাথে বসবাস করতে পারবো। আর এমন নেতাকে আমরা ভোট দিতে চাই, যিনি আমাদের অধিকার নিয়ে সংসদে কথা বলবেন। এলকায় শান্তিতে বসবাস করতে পারবো। সরকারি সুযোগসুবিধা পাবো।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারতের রাচি থেকে ২২০ বছর আগে মুণ্ডারা আসে এ এলাকায়। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ৯ ইউনিয়নের কাশিপুর, গোপালপুর, ধুমঘাট, পাঁচশ বিঘা, ঈশ্বরীপুর, শ্রীফলকাটী, কদমতলা, কচুখালী, সাহেবখালী, শৈলখালী, ভেটখালী, তারানীপুর, কালিঞ্চী, বুড়িগোয়ালিনী, দাঁতনেখালী, কলবাড়ী, সোরা, পার্শেমারী গ্রামে ৪৫০টি পরিবারে দুই হাজার ৫৫০ সদস্য নিয়ে এই সম্প্রদায়ের বসবাস।
আধুনিক সভ্যতার যুগেও আদিম জীবনে অভ্যস্ত এরা। কোনো কোনো মুণ্ডা পরিবারের সদস্য আধুনিকতার সামান্য ছোঁয়া পেলেও অধিকাংশই বঞ্চিত। অক্ষর জ্ঞানহীন এবং সরল বিশ্বাসী হওয়ায় প্রতারকের খপ্পরে পড়েন বলে জানান তারা।
বুড়িগোয়ালিনী গ্রামের উত্তম মুণ্ডা, জগদীস মুণ্ডা ও সাগরিকা মুণ্ডা বলেন, ভোটের দিন আমাদের শুধু ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা। জীবিকার তাগিদে বনজঙ্গলে গেলে জলদস্যু ও বনদস্যুদের কারণে নিরাপত্তা নেই, মাছ শিকারে গেলে নিরপত্তা নেই, মধু আহরণে গেলেও নিরপত্তা নেই। আমরা ভয়-ডরহীন থাকতে চাই। যে সরকার আমাদের নিরপত্তার কথা ভাববে। আমরা জেনে বুঝে সেই সরকারের প্রার্থীকেই ভোট দেব।দাতনেখালী গ্রামের আরতি মন্ডল, তাপস মন্ডল, প্রদীপ মন্ডল বলেন, উপকূলীয় এলাকায় তাদের বসবাস। প্রাকৃতিক দুর্যোগে নারী ও শিশুরা বেশি অসহায় হয়ে পড়ে। প্রার্থীরা বলেছেন এবার ভোটের পর তাদের সমস্যার কথা তারা ভাববে। সেই আশাতেই এখনও ভোট দেব।
আদিবাসী মুণ্ডা ডাক্তার রামপ্রসাদ মুণ্ডাসহ অনেকে বলেন, লবণাক্ততার কারণে এলাকার অনেক জমি একফসলি হওয়ায় কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে। বাড়ছে বেকারের সংখ্যা। মুণ্ডারা তাদের আদি পেশা ছেড়ে শহরমুখী হচ্ছে। ভোটে মুণ্ডা সম্প্রদায় ও সংখ্যালঘুদের এবার প্রার্থীরা যে সব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন সেগুলো বাস্তবায়ন হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। উপকূলের এই নৃগোষ্ঠীর চাওয়া, ভোটের দিন যেন নির্বিঘে তারা ভোট দিতে পারেন। ভোটে পাশ ফেল থাকবে। তাঁরা যেন সহিংসতার শিকার না হন। বিজয়ীরা যেন মুণ্ডা সম্প্রদায়ের কথা যেন ভুলে না যান-এটাই তাঁদের একমাত্র প্রত্যাশা।
সুন্দরবন আদিবাসী মুণ্ডা সংস্থা (সামস)’র দেওয়া তথ্যমতে, মুণ্ডারা খুবই পরিশ্রমী। মুণ্ডা পরিবারের নারী-পুরুষ জীবিকার তাগিদে ঘরে-বাইরে কাজ করেন। দুঃখ দৈন্য তাদের ছেড়ে যেতে চায় না। তাদের শিশুরা জন্মের পরই দুঃখ-কষ্টের সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত হয়। হাতে গোনা কিছু শিশু ছাড়া অধিকাংশই শিক্ষা থেকে পিছিয়ে। বাবা-মায়ের কষ্টের সংসারে তারাও সে কষ্টের ভাগ নেয় হাসিমুখে।
বর্তমানে শ্যামনগরে মুণ্ডাদের পরিবারের ৯৫ শতাংশ ভূমিহীন। অশিক্ষা, অজ্ঞতা ও অভাবকে পুঁজি করে ভূমিদস্যুরা তাদের সম্পত্তি আত্মসাৎ করেছে। বর্তমানে চার শতাধিক পরিবারের মধ্যে তিনজন গ্রাম পুলিশ এবং ১৩ জন বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন। অন্য সদস্যরা দিন মজুরের কাজ করেন।





