২৭শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান কিনছে বাংলাদেশ, ভারতের হুঁশিয়ারি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বহু বছর ধরে টানাপোড়েন চলা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটছে বাংলাদেশের। নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে সামরিক সম্ভাব্য চুক্তি ও গভীর সহযোগিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তনের পর থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন দিকে মোড় নিয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ ভারত সরকার বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদকে ‘অপেক্ষা করে পার হয়ে যেতে’ চায় এবং ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আগ্রহী।
কূটনৈতিক সূত্রমতে, বাংলাদেশ-পকিস্তানের রাষ্ট্রীয় শীর্ষ দুই নেতার সাক্ষাতের পর সম্প্রতি পাকিস্তান সফর করেন বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফট্যানেন্ট জেনারেল এসএম কামরুল হাসান। এতে পাকিস্তান থেকে যুদ্ধবিমান জেএফ-১৭ থান্ডার বা সুপার মুশশাকের মতো প্লেন কেনা মানে কেবল অস্ত্র কেনা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সামরিক অংশীদারত্বের সূচনা ঘটতে যাচ্ছে। আর এসব ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক ঘিরে নতুন সমীকরণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বিশ্ব গণমাধ্যমগুলোতেও। কূটনীতি ও অর্থনীতির পর এবার পাকিস্তানের সাথে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরালো করতে বাংলাদেশ বেশ আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। এছাড়া পাকিস্তানের ওপর থাকা বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার পর বাণিজ্যের সম্ভাবনাও খুলে গেছে দুই দেশের। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে সরাসরি পাকিস্তানি দুই জাহাজ এসেছে ইসলামাবাদের পণ্য নিয়ে। আর আগামী ২৯ জানুয়ারি থেকে ঢাকা-করাচি রুটে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করতে যাচ্ছে জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এমন পরিস্থিতিতে দক্ষিণ এশিয়ায় ভূ-রাজনীতিতে ওলটপালটের আভাস দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সাবেক এক কর্মকর্তার মতে, যুদ্ধবিমান কেনা মানে তিন থেকে চার দশকের অঙ্গীকার। তার কথায়, বাংলাদেশ যদি জেএফ-১৭ বা সুপার মুশশাক প্রশিক্ষক বিমান নেয়; এর মানে তারা প্রশিক্ষণ এবং বিক্রয়োত্তর সেবার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত। তারা চীনা জে-১০ যুদ্ধবিমানের প্রতিও আগ্রহ দেখাচ্ছে। যার অর্থ কৌশলগতভাবে তারা ভবিষ্যতে কাদের সঙ্গে যুক্ত হতে চায় তা নির্ধারণ করছে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. শামীম কামাল বলেন, ঢাকায় সরকার পরিবর্তনের পর পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পর্ক নতুন দিকে মোড় নিয়েছে। যুদ্ধবিমান জেএফ-১৭ থান্ডার প্লেন কেনা মানে কেবল অস্ত্র কেনা নয়, বরং বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অংশীদারত্বের সূচনা হওয়া। এই যুদ্ধবিমানটি ৪.৫ প্রজন্মের একটি মাল্টি রোল যুদ্ধবিমান যা শক্তিশালী রাডার ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সজ্জিত। এটি বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধ মিশনে অংশ নিতে সক্ষম। হালকা ওজনের এই যুদ্ধবিমানের কার্যকারিতা ভারতের সাথে পাকিস্তানের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সময়ে প্রমাণিত হয়েছে বলে তারা মনে করেন তিনি।
জানা গেছে, জেএফ- ১৭ থান্ডার পাকিস্তান ও চীনের যৌথ উদ্যোগে তৈরি একটি হালকা, সব আবহাওয়ায় ব্যবহারের উপযোগী বহুমুখী যুদ্ধবিমান। পাকিস্তানের কামরায় অবস্থিত পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্সে এর পূর্ণাঙ্গ সংযোজন করা হয়। যদিও এর বড় অংশ তৈরি হয় চীনে। সবচেয়ে আধুনিক ব্লক-থ্রি সংস্করণটি ‘চার দশমিক পাঁচ প্রজন্মের’ যুদ্ধবিমান হিসেবে ধরা হয়। যাতে উন্নত অ্যাভিওনিক্স, এএসইএ রাডার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চারদিনের যুদ্ধ জেএফ-১৭ ও পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সক্ষমতাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। ওই সংঘর্ষে পাকিস্তান দাবি করে, তারা ভারতের একাধিক যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। ভারত প্রথমে তা অস্বীকার করলেও পরে কিছু ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করে।
অপরদিকে, পাকিস্তান থেকে জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাব্য বিষয়টি নিয়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ভারত। গত ৯ জানুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে- এমন সব ধরনের উন্নয়ন আমরা সতর্কভাবে নজরে রাখছি।’ ঢাকা-করাচি সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালুর বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র জয়সওয়াল বলেন, আগামী ২৯ জানুয়ারি থেকে এ রুটে ফ্লাইট চালুর সিদ্ধান্ত এবং ভারতীয় আকাশসীমা ব্যবহারের বিষয়টি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান বিমান পরিষেবা চুক্তি অনুযায়ী সমাধান করা হবে। তিনি আরও বলেন, এই ঘটনাগুলোকে প্রায়ই অতীতের ব্যক্তিগত শত্রুতা, প্রতিশোধপরায়ণতা, রাজনৈতিক মতপার্থক্য কিংবা বাহ্যিক কারণের সঙ্গে যুক্ত করার একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি চরমপন্থীদের সাহস জোগায় এবং সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়িয়ে তোলে।
এদিকে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে জানিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে উত্তেজনা যদি বাড়ে; তাহলে পাকিস্তানের সম্পৃক্ততা প্রায় নিশ্চিতভাবেই পরোক্ষ থাকবে এবং কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। সাম্প্রতিক এসব ক্রিয়াকলাপের অর্থ হলো- প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে হোয়াইট হাউস ও পশ্চিমাবিশ্বে ভারতের দুর্বল অবস্থানের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশ লাভবান হবে।

আরও পড়ুন