নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি অপারেটরকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে দ্বিতীয় দিনের মতো উত্তাল রয়েছে বন্দর এলাকা। বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ডাকা ২ দিনের কর্মবিরতির শেষ দিন রবিবার (১ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকেই বন্দরের অপারেশনাল ও প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। সকাল ৮টা থেকে শুরু হওয়া এই কর্মবিরতির কারণে জেটিতে অবস্থানরত জাহাজ থেকে কনটেইনার ও পণ্য ওঠানামা বন্ধ রয়েছে। এতে দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দরে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা করা হচ্ছে।সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক কম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে চট্টগ্রাম বন্দরে অস্থিরতা বিরাজ করছে। হাইকোর্ট গত বৃহস্পতিবার এনসিটি পরিচালনায় বিদেশি কম্পানির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি-সম্পর্কিত চলমান প্রক্রিয়া নিয়ে করা রিট খারিজ করেন। চুক্তি করার প্রক্রিয়াটিকে বৈধ ঘোষণা করেন উচ্চ আদালত।এই আদেশের খবর চট্টগ্রাম বন্দরে ছড়িয়ে পড়লে শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়।
বৃহস্পতিবার বন্দর ভবনে অফিস চলাকালে আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। শনি ও রবিবার সকাল ৮টা থেকে ৮ ঘণ্টা করে কর্মবিরতির ডাক দেওয়া হয়। সেদিনই বন্দর কর্তৃপক্ষ এক বিজ্ঞপ্তিতে অফিস চলাকালে মিছিল, মহড়া এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়ে দেয়।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গতকাল শনিবার রাত সাড়ে ১১টায় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) এক গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বন্দর এলাকায় মিছিল-সমাবেশ ও অস্ত্র বহনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২ মার্চ পর্যন্ত এক মাসের জন্য এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। আজ রবিবার সকাল থেকেই বন্দর ভবন ও এর আশপাশের এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) টার্মিনালে কাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনালে (সিসিটি) নামমাত্র কিছু কার্যক্রম চললেও মূল অপারেশনাল চেইন ভেঙে পড়েছে। বন্দরের যন্ত্রপাতি অপারেটর ও শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দেওয়ায় বহির্নোঙরে জাহাজের জট আরো বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বার্থ অপারেটরস, শিপহ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বোটসোয়া) সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী বলেন, ‘শ্রমিক ও অপারেটররা কাজে না আসায় জিসিবিতে কোনো কাজ হচ্ছে না। আমরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছি।’
এদিকে আন্দোলনের মুখে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা চার শ্রমিক নেতাকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকার পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনালে (আইসিটি) বদলি করা হয়েছে। বদলীকৃতরা হলেন— ইব্রাহিম খোকন, মো. হুমায়ুন কবির, মো. আনোয়ারুল আজিম ও মো. ফরিদুর রহমান। শ্রমিক নেতারা একে ‘প্রতিহিংসামূলক’ পদক্ষেপ বলে দাবি করেছেন।
বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, ‘স্বার্থবিরোধী চুক্তির মাধ্যমে লাভজনক এনসিটি টার্মিনাল দুবাইভিত্তিক কম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে। আমরা দেশ ও বন্দরের স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানাচ্ছি। আজকের কর্মসূচি বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলবে। এরপরও দাবি মানা না হলে আরো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’
ব্যবসায়ীরা জানান, বন্দরের এই অচলাবস্থার কারণে সাপ্লাই চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সঠিক সময়ে পণ্য ডেলিভারি না হলে শিল্পোৎপাদন ও নিত্যপণ্যের বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।




