২৭শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

অস্থির পেঁয়াজের বাজার, ঝাঁজ বাড়তে বাড়তে ছাড়িয়েছে দেড়শ টাকা

মোহাম্মদ জাহেদ উল্লাহ চৌধুরী: চট্টগ্রামে অস্থির হয়ে আছে পেঁয়াজের বাজার। ঝাঁজ বাড়তে বাড়তে সর্বশেষ বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বাজারে এখন দেড়শ টাকা ছাড়িয়েছে মসলাটির দাম। বাড়তি দামে ভোক্তার কষ্ট হলেও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মিলেছে আশাজাগানিয়া তথ্য। আমদানি এড়িয়ে বিশেষত, ভারত থেকে পেঁয়াজ আনা বন্ধ করে দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজ দিয়েই এবার চাহিদার প্রায় পুরোটা যোগান দিয়েছে বাংলাদেশ। এদিকে বছরের শেষ দুই মাসে কেন পেঁয়াজের দাম বাড়ে সেটি নিয়ে পর্যালোচনা তৈরি করেছে বাংলাদেশ ট্রেড এন্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি)। সংস্থাটির অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, চার কারণেই এই সময়ে পেঁয়াজের দাম বাড়ে। সেই কারণগুলো হলো উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য; পেঁয়াজ সংরক্ষণের অভাব; মৌসুমের শেষ পর্যায় ও বৃষ্টিতে পেঁয়াজের ক্ষতি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পাইকারি বাজারের প্রভাব এখনো খুচরা বাজারে পড়েনি। বহদ্দারহাট-চকবাজার-দুই নম্বর গেট ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা বাজারে মানভেদে পেঁয়াজ ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বহদ্দারহাট এলাকায় ভ্যানে করে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ১৪৫ টাকায় বিক্রি করছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, আড়ত থেকে পেঁয়াজ কেনার পর বহদ্দারহাট পর্যন্ত আনতে খরচ পড়ে যায় ১৩৫-১৪০ টাকা। আমরা ৫ টাকা লাভে বিক্রি করতেছি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশে বছরে প্রায় ৩৮ থেকে ৪০ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে ৩২ লাখ মেট্রিক টনের মতো পেঁয়াজ দেশে কৃষকরা উৎপাদন করেন। বাকি সাত থেকে আট লাখ মেট্রিক টন আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হয়। এর মধ্যে ৯৯ শতাংশ পেঁয়াজ আমদানি করা হতো ভারত থেকে। এরপর চীন, পাকিস্তান, মিশর, তুরস্ক থেকেও আমদানি করা হয়। যদি-ও এসব পেঁয়াজের চাহিদা দেশের বাজারে তেমন নেই বললেই চলে।
জানা গেছে, ভারত থেকে দেশে পেঁয়াজ আমদানি হয় বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে। সেই পেঁয়াজ দেশের বিভিন্ন আড়তের পাশাপাশি বড় অংশ আসে ভোগ্যপণ্যের বৃহত্তম পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে। এছাড়া, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা পেঁয়াজের পুরোটাই পৌঁছে খাতুনগঞ্জের আড়তে। এরপর সেখান থেকে খুচরা বাজারে সরবরাহ করা হয়।
ব্যবসায়ীরা বলেছেন, নতুন আগাম পেঁয়াজ এখনো বাজারে পুরোপুরিভাবে আসতে শুরু করেনি। সেজন্য বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহও আগের মতো নেই। এসব কারণে বেড়েই চলেছে পণ্যটির দাম। খাতুনগঞ্জের অন্যতম বৃহত্তম পেঁয়াজের আড়ত মেসার্স কাজী স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. জাবেদ ইকবাল বলেন, সরবরাহ কম থাকায় গত সপ্তাহে পেঁয়াজের দাম অতিরিক্ত বেড়েছিল। তবে এই সপ্তাহের শুরুতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে আসায় সেটির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আগের চেয়ে কমেছে দাম। আমদানি শুরুর পর কয়েকদিনের মধ্যে পেঁয়াজের দাম স্বাভাবিক হয়ে ওঠবে।
জানা গেছে, গত আগস্ট থেকে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে পেঁয়াজের দর উর্ধ্বমুখী হয়ে আছে। অক্টোবরে এসে তা খুচরায় কেজি ১০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। গত সপ্তাহ পর্যন্ত দেশি পেঁয়াজ মানভেদে ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। কিন্তু চলতি সপ্তাহের প্রথমদিন শনিবার (৬ নভেম্বর) থেকে চট্টগ্রামে খুচরায় পুরনো দেশি পেঁয়াজ মানভেদে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে। বাজারে মেহেরপুরের আগাম ফলনের কিছু পেঁয়াজও এসেছে। সেগুলো প্রতিকেজি ১৪০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
খাতুনগঞ্জের আড়তে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার আড়ত থেকে মজুত দেশি পেঁয়াজ প্রতিকেজি ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর মেহেরপুরের নতুন পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ১০৫ থেকে ১১০ টাকায়। তবে পাইকারিতে দাম কিছুটা কমেছে। এদিন মজুত দেশি পেঁয়াজ ১১৫ থেকে ১২০ টাকা এবং নতুন পেঁয়াজ ১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের বৃহত্তর পাইকারি মার্কেট হামিদুল্লাহ মিয়া বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস বলেন, আমরা এতদিন ধরে দেশীয় যে পেঁয়াজটা বিক্রি করছিলাম, সেটার মজুত প্রায় শেষ হয়ে গেছে। এটা শুধু খাতুনগঞ্জে শেষ হয়েছে, এমন নয়। পাবনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ি, কুষ্টিয়া- এসব এলাকায় মোকামেও পেঁয়াজ নেই। এজন্য দাম কিছুটা বেড়েছে। আবার ভারত থেকে আমদানিও বন্ধ। সরকার পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি বন্ধ রেখেছে। সব মিলিয়ে বাজারে এখন কিছুটা ক্রাইসিস চলছে।
এদিকে খাতুনগঞ্জের আড়তে এবং খুচরা বাজারে মেহেরপুরের আগাম ফলনের কিছু পেঁয়াজের সরবরাহ দেখা গেছে। কয়েকটি আড়তে ৮-১০ বস্তা করে নতুন পেঁয়াজ দেখা গেছে। নতুন পেঁয়াজ আসতে শুরু করলেও দামের ক্ষেত্রে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। বাজারে সাধারণত ডিসেম্বর মাসে নতুন ফলনের মুড়িকাটা পেঁয়াজ আসে। এর পর জানুয়ারি থেকে বাজারে আসে রাজবাড়ি, ফরিদপুর, মেহেরপুর, জামালপুর, কুষ্টিয়াসহ অন্যান্য জেলার পেঁয়াজ। চট্টগ্রামেও এখন পেঁয়াজের আবাদ হচ্ছে।
আড়তদার মো. ইদ্রিস বলেন, মেহেরপুরের পেঁয়াজ, এটা আগাম ফলন, এটা মাত্র আসতে শুরু করেছে। এটা দিয়ে বাজার কাভার হবে না। চলতি মৌসুমের ফলন মাত্র ক্ষেত থেকে তোলা শুরু হয়েছে। সেটা মোকামে আসতে আরও সপ্তাহ দুয়েক লাগবে। এরপর বাজারে আসতে লাগবে আরও সপ্তাহখানেক। সব মিলিয়ে পেঁয়াজের দাম কমার জন্য আরও মাসখানেক লাগবে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত পেঁয়াজের দাম নিয়ে ঝামেলা থাকবে।
এদিকে কেন পেঁয়াজের দাম বাড়ে সেটি নিয়ে পর্যালোচনা তৈরি করেছে বাংলাদেশ ট্রেড এন্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি)।তাদের মতে ট্যারিফ কমিশনের অনুসন্ধানে বেরিয়েছে সংরক্ষণের অভাব, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, বৃষ্টিতে পেঁয়াজ নষ্ট ও মৌসুম শেষ হওয়ায় বছরের এই সময়ে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে।
সংরক্ষণের অভাব: সাধারণত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত পেঁয়াজ সংরক্ষণের মৌসুম। কৃষকেরাই নিজ উদ্যোগে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করেন। সরকারি সংরক্ষণাগার না থাকায় পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায় বলে চিহ্নিত করেছে ট্যারিফ কমিশন। মৌসুমের শেষ পর্যায়: নভেম্বর ও ডিসেম্বর হলো পেঁয়াজ মৌসুমের শেষ পর্যায়। এ সময়ে কৃষকের মজুতও কমতে থাকে। সে কারণেও বেড়ে যায় পেঁয়াজের দাম। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য: কৃষকের কাছ থেকে বাজারে আসা পর্যন্ত একাধিকবার হাত বদল হয় পেঁয়াজ। প্রতি ধাপেই মুনাফা করেন মধ্যস্বত্বভোগীরা। মধ্যস্বত্বভোগীদের অতি মুনাফার কারণেও বেড়ে যায় পেঁয়াজের দাম। বৃষ্টিতে পেঁয়াজ নষ্ট: গত আগস্টে পেঁয়াজ উৎপাদন হয় এমন যেমন পাবনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মেহেরপুরসহ একাধিক জেলায় তুলনামূলক বেশি বৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে বিপুল পরিমাণ আগাম পেঁয়াজ নষ্ট হয়েছে। এটিও পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হয়েছে।
তবে ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়েছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র সহ সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন। তিনি বলেন, ভারতে এখন পেঁয়াজের দাম ৩-৪ টাকা। দেশটি পেঁয়াজ রপ্তানিতে শুল্কও কমিয়েছে। বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা তাই ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করার অজুহাত দাঁড় করাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন। কেননা ভারত থেকে এখন পেঁয়াজ আমদানি করতে পারলে কয়েকগুণ বেশি লাভ করতে পারবেন।
পেঁয়াজ ব্যবসায়ী বৃহত্তর চাক্তাই আড়তদার মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ফোরকান বলেন, এবার দেশীয় পেঁয়াজ দিয়ে পুরো বছর একহাতের ব্যবসা হয়েছে। ভারতের কেরালা, মহারাষ্ট্র থেকে পেঁয়াজ আমদানি এবার ছিল না বললেই চলে। দেশীয় পেঁয়াজের সঙ্গে আমদানি থাকলে একটা প্রতিযোগিতা থাকে। তখন দাম স্থিতিশীল থাকে। তবে দেশীয় পেঁয়াজ দিয়েই যেহেতু বছরটা প্রায় পার করা গেছে, আমদানি তেমন করতে হয়নি, সেটাও একটা ভালো লক্ষণ।

আরও পড়ুন