অনলাইন ডেস্ক: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট শেষ হয়েছে বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি)। ভোটকে কেন্দ্র করে চারদিনের ছুটি উপভোগ করছে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের মানুষ। তবে নির্বাচন ঘিরে পরিবহন সংকট ও বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকট থাকায়, প্রভাব পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেই বাজার অস্থির হয়ে ওঠে।আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেশিরভাগ সবজি, মাছ, মাংস ও ডিমের দাম বাড়িয়েছে ব্যবসায়ীরা। সপ্তাহ ব্যবধানে এসব পণ্যের দাম ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন ভোক্তারা।শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর সূত্রাপুর, রায়সাহেব বাজার, নয়াবাজার, ধূপখোলা মাঠ কাঁচাবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার বাজার ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, নির্বাচনের কারণে কিছু এলাকায় যানবাহন চলাচলে বিধিনিষেধ, চেকপোস্ট এবং নিরাপত্তা তল্লাশির ফলে পণ্য পরিবহনে দেরি হচ্ছে। অনেক ট্রাক সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে পারে না। এছাড়া ভোটের কারণে অধিকাংশ ব্যবসায়ী গ্রামের বাড়িতে গেছেন। ফলে বাজারে সরবরাহ কমে গেছে, যার সুযোগে দাম বেড়েছে।ভোক্তারা বলছেন, শুধু নির্বাচন না রোজাসহ যেকোন উৎসব অনুষ্ঠানে বাজার পরিস্থিতি বেসামাল হয়ে যায়। এর অন্যতম কারণ হলো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি সরকার। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বাজার করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।সরেজমিনে রাজধানীর সূত্রাপুর, রায়সাহেব বাজার, নয়াবাজার ঘুরে দেখা গেছে, নির্বাচনের কারণে বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।ফলে দাম বেড়েছে বেশিরভাগ পণ্যের। নতুন আলুর কেজি বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ টাকায়। এ ছাড়া মান ও জাতভেদে শিম ৬০ থেকে ৮০ টাকা, শালগম ৪০ থেকে ৪০ টাকা এবং বেগুন ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বরবটির দাম কিছুটা বেশি; প্রতি কেজি কিনতে গুনতে হচ্ছে ৯০ থেকে ১১০ টাকা। প্রতি কেজি টমেটো বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়।
আকারভেদে প্রতিটি ফুলকপি ৫০ থেকে ৬০ এবং বাঁধাকপি ৪০ থেকে ৫০ টাকায় কেনা যাচ্ছে। মুলার কেজি কেনা যাচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা দরে। বাজারে পেঁয়াজের দামও স্থিতিশীল রয়েছে। মাত্রই মৌসুমের পেঁয়াজ বাজারে আসা শুরু করেছে, এ কারণে দামও সহনীয়। প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তবে কাঁচা মরিচের দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। গত তিনদিনের ব্যবধানে কাঁচা মরিচের দাম কেজিতে ৬০ থেকে ৮০ টাকা বেড়েছে। তাতে এক কেজি কাঁচা মরিচ এখন বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ২০০ টাকায়। তিনদিন আগে প্রতি কেজি মরিচ ১০০–১২০ টাকায় কেনা যেত।
এছাড়া প্রতি কেজি ঝিঙা ১০০, ধুনদুল ৮০, গাজর ৫০ টাকা, শসা ৬০ টাকা, করলা ১৬০ টাকা, চিচিন্দা ১০০ টাকা, শালগম ৫০ টাকা, মটরশুঁটি ১২০ টাকা, বেলু প্রতি হালি ১০০ থেকে ১২০ টাকা, লাউ ৮০ থেকে ১০০ টাকা, আদা ১২০ টাকা, রসুন ১৬০ টাকা, ধনে পাতা ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
সবজি ব্যবসায়ী মো. মিলন মিয়া বাংলানিউজকে বলেন, নির্বাচনের কারণে কিছু পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকায় রাজধানীতে গাড়ি আসেনি। ফলে বাজারে একটা ঘাটতি রয়েছে। আবার ভোটের কারণে অধিকাংশ ব্যবসায়ী গ্রামে থাকায় তাদের দোকান বন্ধ রয়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহ কমে গেছে, এতে দাম বেড়েছে।নয়াবাজারে বাজার করতে আশা মো. তুষার বলেন, নির্বাচনকালীন সময়েও যদি পণ্য পরিবহন স্বাভাবিক রাখা যায় এবং বাজার তদারকি জোরদার করা হয়, তাহলে এমন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। না হলে সাধারণ মানুষকেই আবারও বাড়তি দামের বোঝা বইতে হবে। তাছাড়া কিছু অসাধু ব্যবসায়ী একটু সুযোগ পেলেই দাম বাড়িয়ে দেয়। আর এটা সম্ভব হয় সরকারের অব্যবস্থাপনার জন্য।
মাংসের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হতো ১৮০ টাকায়, সেখানে এখন ২৪০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে সোনালি মুরগির দাম বেড়ে প্রতি কেজি ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। শবেবরাতের আগে ছিল ২৮০ টাকা। গরুর মাংস কেজিতে বেড়ে হয়েছে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা, যা আগে ছিল ৭৫০ থেকে ৭৮০ টাকার মধ্যে। খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকা কেজি।
মাংস বিক্রেতারা জানান, গত কয়েকদিন ধরে গাড়ি আসে না। ফলে বাজারে সরবরাহ কমেছে। আর আগের মতো ক্রেতাও নেই। দোকানে প্রায় অলস সময় পার করা লাগে। সরবরাহ কম থাকলে দাম বাড়বেই।
এদিকে মাছের বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতি কেজি পাঙাশ ২০০ থেকে ২২০ টাকা, তেলাপিয়া ২০০ টাকা, রুই ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, মৃগেল ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা, দেশি টেংরা ৭৫০ টাকা, বাইন ৬০০ টাকা, শিং ৪০০ থেকে ১০০০ টাকা, পোয়া ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা, শোল ৭০০ টাকা এবং টাকি ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে চিংড়ির দাম তুলনামূলক বেশি। আকার ও জাতভেদে প্রতি কেজিতে খরচ করতে হচ্ছে ৫৫০ থেকে ৯০০ টাকা, আইড় ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা, পাবদা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, মলা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। তবে ইলিশের দাম আকাশচুম্বী ছোট ইলিশ প্রতি কেজি ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকা, মাঝারি ইলিশ ২ হাজার থেকে ২৫০০ টাকা এবং বড় ইলিশ ২৫০০ থেকে ৩৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
মুদিপণ্যের মধ্যে চিনি, ছোলা ও পেঁয়াজের দাম কম হলেও ভোজ্যতেলের দাম তুলনামূলক বেশি। বর্তমানে বোতলজাত প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ১৯০ থেকে ১৯৫ এবং খোলা সয়াবিন ১৭৫ থেকে ১৮৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রতি লিটার খোলা পামওয়েল বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ থেকে ১৬২ টাকা দরে। সরকারি সংস্থা টিসিবির তথ্যমতে, এক বছরের ব্যবধানে সয়াবিন তেলের দাম তিন থেকে ১০ শতাংশ এবং পামওয়েলের দাম পাঁচ শতাংশ বেড়েছে।
এছাড়া মানভেদে প্রতিকেজি আদা ও রসুন ১৪০-২২০ টাকায়, চিনি ৯৮-১০৫ টাকায়, পেঁয়াজ ৪০-৫০ টাকায়, ছোলা ৮০-১০০ টাকায়। প্রতি হালি মুরগির ডিম বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা, হাঁসের ডিম ৭০ থেকে ৮০ টাকা এবং দেশি মুরগির ডিম ১০০ থেকে ১২০ টাকা হালি বিক্রি হচ্ছে। আর তরল দুধ ও প্যাকেটজাত দুধের দামও লিটারপ্রতি ১০-২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
মুদি পণ্যের বিক্রেতারা জানিয়েছেন, কয়েক দিন ধরে সরবরাহকারীদের (ডিলার) কাছ থেকে চাহিদামতো সয়াবিন তেল পাচ্ছেন না খুচরা বিক্রেতারা। তবে দাম বাড়েনি। বাজারে ছোট দানার মসুর ডাল ১৬০–১৬৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তিন সপ্তাহ আগে এ দাম কেজিতে ২০ টাকা কম ছিল। অবশ্য মোটা দানার মসুরের দাম কেজিতে ৫ টাকা কমে ৮৫–৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
জানা গেছে, কয়েকদিন পরেই রমজান। আর এ উপলক্ষে প্রতিবছর রমজানকে কেন্দ্র করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থা, পুলিশ, আনসার, র্যাব ও বিজিবিসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের সমন্বয়ে ১৫-২০টি টিম বাজার মনিটরিংয়ে নামলেও এ বছর তেমন কোনও উদ্যোগ চোখে পড়েনি। নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত থাকায় জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারাও বাজার পরিস্থিতিতে নজর দিতে পারছেন না। ফলে বাজার ব্যবস্থাপনা চলে গেছে অতিরিক্ত মুনাফাখোরদের দখলে।
এ বিষয়ে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বাংলানিউজকে বলেন, নির্বাচনের অজুহাতে একটি অসাধু ব্যবসায়ী চক্র কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। বাস্তবে সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি না থাকলেও পরিবহন সমস্যা ও নিরাপত্তার কথা দেখিয়ে তারা অতিরিক্ত মুনাফা লুটছে। এর ফলে সাধারণ ভোক্তারা জিম্মি হয়ে পড়ছেন, আর বাজারে ন্যায্য দামের পরিবর্তে চলছে সুযোগসন্ধানীদের আধিপত্য।




