সন্দ্বীপ প্রতিনিধি : ১৯৯৩ সালে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার উড়িরচর উপকূলে মেঘনা চ্যানেলে ডুবোচরের ধাক্কায় মাটির নিচে চাপা পড়ে যায় লাইবেরিয়ান জাহাজ এম ভি টনি বেস্ট। সেই জাহাজ উদ্ধার করতে ২৫ দিন ধরে এক্সকাভেটর দিয়ে মাটি সরিয়ে গর্ত খননকাজ চলছে। ৪৭০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৬৮ ফুট প্রস্থের এই বিশাল জাহাজ উদ্ধার করতে অন্তত ৫০ ফুট পর্যন্ত গর্ত খনন করা হবে।
উড়িরচর বাংলাবাজার থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে, চরের উত্তর-পশ্চিমে নেংটা এলাকায় কোস্ট গার্ড কন্টিনজেন্টের পাশে কয়েকটি এক্সকাভেটর দিয়ে প্রায় ৫০ ফুট চওড়া এবং ২০০ ফুট দীর্ঘ জায়গাজুড়ে গর্ত খোঁড়া হচ্ছে।তবে ইতিমধ্যে ১৭ ফুট গভীর পর্যন্ত খোঁড়া হলেও কাদায় হারিয়ে যাওয়া জাহাজের মূল কাঠামোর কোনো দেখা মেলেনি।
সূত্র জানায়, দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং একাধিকবার মালিকানা পরিবর্তনের পর জাহাজটি মাটির নিচ থেকে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, জাহাজটি যখন আটকে পড়ে, তখন চারপাশে ছিল কেবল জলরাশি, আশপাশে ছিল না কোনো স্থায়ী বসতি। পরের তিন দশকে সেখানে চর জেগে ওঠে, যাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে বসতিও।চরে শুরু হয় জমি চাষাবাদ। একই সঙ্গে মাটির নিচে চাপা পড়তে শুরু করে জাহাজটি। এক পর্যায়ে এটি পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়।এলাকাবাসী জানায়, প্রায় ১০ বছর আগে চরটিতে চাষাবাদ শুরু হয়।মাটির নিচে চাপা পড়ায় জাহাজটির কথা এলাকার মানুষ প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। হঠাৎ আবার খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হওয়ায় জাহাজটি নিয়ে বাসিন্দাদের মধ্যে কৌতূহলের সৃষ্টি হয়।জাহাজ প্রত্যক্ষদর্শী মহিষ বাথানের মালিক মুকবুল হোসেন (৭৫) বলেন, ‘বড় জাহাজ একখান আটকি যাইবের ঘটনা মনে আছে। কিন্তু কত দিন আগে, তা ঠিক করি বইলতে হাইরতাম ন।’
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, পশ্চিম আফ্রিকার আটলান্টিক উপকূলবর্তী দেশ লাইবেরিয়ার পতাকাধারী এই জাহাজটি ১৯৭১ সালে যাত্রা শুরু হয়েছিল।১৯৯৩ সালে এটি বাংলাদেশের নোয়াখালী উপকূলের কাছে আটকে পড়ে সমুদ্রযাত্রার ইতি টানে। জাহাজটির বর্তমান মালিকানায় রয়েছে মেসার্স রায়হান ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা জাহাজটির দৈর্ঘ্য ৪৭০ ফুট আর প্রস্থ ৬৮ ফুটের মতো। এখন স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রির জন্য জাহাজটি তুলে আনার কাজ চলছে। এর আগে এটি আটকে পড়ার পর শুরুতে উদ্ধারের চেষ্টা করেছিল তখনকার মালিকানায় থাকা প্রতিষ্ঠান বেস্ট শিপিং করপোরেশন। তবে ব্যর্থ হয়ে জাহাজটি নিলামে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের আদালতের শরণাপন্ন হয় প্রতিষ্ঠানটি। কাদায় আটকে পড়া জাহাজকে কেন্দ্র করে শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, বেস্ট শিপিং করপোরেশন, জাহাজের স্থানীয় প্রতিনিধি, কর্মকর্তা ও ক্রু—সব পক্ষের স্বার্থ জড়িয়ে পড়ে মামলায়।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের দেওয়ানি বিভাগের অ্যাডমিরালটি স্যুট (সমুদ্র বাণিজ্যসংক্রান্ত মামলা) নম্বর ১৯/১৯৯৩ অনুযায়ী জাহাজটি নিলামে তোলা হয়। ১৯৯৫ সালের ১৫ মার্চ চট্টগ্রামের মুসলিম ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান ৫৪ লাখ টাকায় জাহাজটি নিলামে কিনে নেয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি জাহাজের উপরিভাগের সামান্য কিছু অংশ কেটে নিলেও পুরো জাহাজ তারা উদ্ধার করতে পারেনি। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে কাজ থেমে যায়। পরে ৩০ লাখ টাকায় তারা জাহাজের স্বত্ব বিক্রি করে দেয় অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে। এরপর একের পর এক বদল হয় মালিকানা। তবে কেউ মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা জাহাজের বাকি অংশ আর উদ্ধার করতে পারেনি।
সবশেষ ২০১০ সালে ঢাকার ইউছুফ আলী নামের এক ব্যক্তি জাহাজটি কিনে মাটির নিচ থেকে উদ্ধারের চেষ্টা চালান, কিন্তু সেই চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। মাটিতে বোরিং টেস্টের মাধ্যমে সর্বনিম্ন ৩২ ফুট এবং সর্বোচ্চ ৫০ ফুট গভীরে জাহাজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেছে, ৪০ ফুট গভীরে পৌঁছালে জাহাজটি দৃশ্যমান হবে—এমন আশার কথা জানান উদ্ধারকাজে নিয়োজিত নুরুল হুদা নামের এক কর্মী।
জাহাজটির বর্তমান মালিক মেসার্স রায়হান ট্রেডার্সের প্রোপ্রাইটর জামাল উদ্দিন জানান, জাহাজটি যেখানে চাপা পড়ে আছে, তার ওপরের প্রায় ১০ একর জমি তিনি ক্রয় করেছেন। মাটি খোঁড়াখুঁড়ির জন্য জেলা প্রশাসক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতিও নিয়েছেন বলে জানান। জামাল উদ্দিন বলেন, মাটির এতটা গভীর থেকে জাহাজটি কেটে তুলে আনার কাজ খুব সহজ নয়, এর পরও চেষ্টা চলছে।




