১লা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বার্লিনে ‘আলুর বন্যা’, বিনা মূল্যে আলু নিতে ভিড়

অনলাইন ডেস্ক : জার্মানির রাজধানী বার্লিনে বিনা মূল্যে আলু সংগ্রহ করতে মানুষের ব্যাপক ভিড় দেখা গেছে। চিড়িয়াখানা থেকে শুরু করে স্যুপ রান্নাঘর ও গৃহহীনদের আশ্রয়কেন্দ্র—সবখানেই পৌঁছে যাচ্ছে টনকে টন আলু। দেশটিতে গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ আলু উৎপাদন হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জার্মানিতে গড়ে একজন মানুষ বছরে প্রায় ৬৩ কেজি আলু খেয়ে থাকে।তবে চলতি বছরের ব্যতিক্রমী ফলন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সবচেয়ে বড় আলুপ্রেমীর পক্ষেও এই পরিমাণ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।এই পরিস্থিতিকে স্থানীয়ভাবে বলা হচ্ছে ‘কার্টোফেল-ফ্লুট’ বা আলু-বন্যা। অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে এক কৃষক আলু ফেলে না দিয়ে বিনামূল্যে বিতরণের উদ্যোগ নেন। বার্লিনের বিভিন্ন স্থানে নির্ধারিত কেন্দ্র থেকে মানুষকে বিনামূল্যে আলু সংগ্রহের আহ্বান জানানো হয়।
এই উদ্যোগের আওতায় স্যুপ রান্নাঘর, গৃহহীনদের আশ্রয়কেন্দ্র, কিন্ডারগার্টেন, স্কুল, গির্জা এবং নানা অলাভজনক সংস্থা আলু সংগ্রহ করেছে। এমনকি বার্লিন চিড়িয়াখানাও এই ‘উদ্ধার অভিযানে’ যুক্ত হয়েছে। ফেলে দেওয়া বা বায়োগ্যাস তৈরিতে ব্যবহারের বদলে কয়েক টন আলু পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি দুই ট্রাক ভর্তি আলু ইউক্রেনে পাঠানো হয়েছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপে থাকা সাধারণ বাসিন্দারাও নির্ধারিত কেন্দ্রগুলোতে এসে বস্তা, বালতি কিংবা হাতগাড়িতে করে আলু নিয়ে যাচ্ছেন। শহরের পূর্ব প্রান্তের কাওলসডর্ফ এলাকায় আলু নিতে আসা শিক্ষক অ্যাস্ট্রিড মার্জ বলেন, তিনি আলু নেওয়ার সময় ১৫০টির পর আর গোনা চালিয়ে যাননি। তাঁর ভাষায়, ‘এগুলো দিয়ে বছরের শেষ পর্যন্ত আমার ও প্রতিবেশীদের চলে যাবে।’
‘চার হাজার টন’ নামের এই উদ্যোগটি আয়োজন করেছে একটি বার্লিনভিত্তিক সংবাদপত্র ও পরিবেশবান্ধব সার্চ ইঞ্জিন ইকোসিয়া। গত ডিসেম্বরে লাইপজিগের কাছে এক কৃষকের শেষ মুহূর্তে বিক্রি বাতিল হয়ে যাওয়ায় চার হাজার টন অতিরিক্ত আলু দেওয়ার প্রস্তাব আসে, সেখান থেকেই এই উদ্যোগের সূচনা।
অ্যাস্ট্রিড মার্জ জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথম দেখার সময় তিনি বিষয়টিকে ভুয়া খবর বলে মনে করেছিলেন। বিশাল আলুর স্তূপের ছবি দেখে বিনামূল্যে বিতরণের আহ্বান সত্য হবে বলে তাঁর বিশ্বাস হয়নি।
তীব্র শীতের মধ্যেও এই উদ্যোগ বার্লিনবাসীর মনোবল কিছুটা চাঙা করেছে। তুষারঝড় ও বরফে জমাট রাস্তার কারণে গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও আলু বিতরণ কেন্দ্রগুলোতে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। টেম্পেলহোফার ফেল্ডে আলু সংগ্রহ করতে আসা এক বাসিন্দা জানান, মানুষ পরস্পরকে ভারী বোঝা তুলতে সাহায্য করেছে এবং আলু রান্নার নানা কৌশল একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছে।
এই ঘটনাকে ঘিরে জার্মানিতে আলুর ইতিহাস নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অষ্টাদশ শতকে প্রুশিয়ার রাজা ফ্রেডেরিক দ্বিতীয়ের ‘কার্টোফেলবেফেল’ বা আলু চাষের ফরমানের মাধ্যমে আলু ধীরে ধীরে জার্মানির প্রধান খাদ্যে পরিণত হয়।
এদিকে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ছে নানা ধরনের আলুর রেসিপি। পুষ্টিবিদরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, আলুতে ভিটামিন সি ও পটাশিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিগুণ রয়েছে। বার্লিনের তারকা শেফ মার্কো মুলার আলুকে নতুনভাবে উপস্থাপনের আহ্বান জানিয়ে ভাজা আলুর খোসা দিয়ে বিশেষ ঝোল ও আলুর ভিনেগ্রেট তৈরি করছেন।সাবেক চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মের্কেলের আলুর স্যুপের রেসিপিও আবার আলোচনায় এসেছে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, কাঙ্ক্ষিত দানাদার স্বাদের জন্য তিনি নিজে আলু চটকে নেন এবং মিক্সার ব্যবহার করেন না।তবে এই বিনামূল্যের আলু বিতরণ নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, এতে বাজার আরো ভরে গেছে এবং তাদের উৎপাদিত আলুর দাম কমে যাচ্ছে। পরিবেশবাদীদের মতে, এটি নিয়ন্ত্রণহীন খাদ্যব্যবস্থারই প্রতিফলন, যা ১৯৭০-এর দশকের ‘বাটার পাহাড়’ ও ‘দুধের হ্রদ’-এর স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।আয়োজকদের ধারণা, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এই উদ্যোগ শেষ হবে। তবে এখনো প্রায় তিন হাজার ২০০ টন আলু বিতরণের অপেক্ষায় রয়েছে। সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

আরও পড়ুন