অনলাইন ডেস্ক : ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার নাটকীয় পতনের পর বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে সামনে রেখে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের প্রভাব চ্যালেঞ্জ করে ঢাকায় আধিপত্য বাড়াচ্ছে চীন। তবে তিন দিক থেকে ভারতবেষ্টিত এই দেশটির পক্ষে নয়াদিল্লিকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা প্রায় অসম্ভব।চীনের ক্রমবর্ধমান সক্রিয়তা ও প্রতিরক্ষা চুক্তি শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশে চীন তার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক তৎপরতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সম্প্রতি ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় একটি ড্রোন কারখানা নির্মাণের লক্ষ্যে বাংলাদেশের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বেইজিং। চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনকে নিয়মিত দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল ও কর্মকর্তাদের সাথে কোটি কোটি ডলারের অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করতে দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, চীন এখন নিজেকে বাংলাদেশের কাছে ভারতের চেয়ে বেশি ‘নির্ভরযোগ্য’ অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে তুলে ধরছে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের শৈত্যপ্রবাহ
দীর্ঘ ১৫ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে থাকায় এবং শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয়ে থাকায় দিল্লির সাথে ঢাকার সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে।বিশেষ করে আইপিএল থেকে বাংলাদেশি বোলারকে বাদ দেওয়া এবং ভিসা জটিলতাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের জনমানসে তিক্ততা বেড়েছে।শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার দাবিতে অনড় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যা দিল্লির জন্য একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের মানুষ বিগত সরকারের অপরাধের সাথে ভারতের সমর্থনকে জড়িত বলে মনে করে।
বিএনপি ও জামায়াতের অবস্থান
নির্বাচনী ময়দানে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী একে অপরের বিরুদ্ধে বিদেশি স্বার্থ রক্ষার অভিযোগ তুলছে।বিএনপি নেতা তারেক রহমান সবার সাথে বন্ধুত্ব রক্ষার কথা বললেও দেশীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির মতো দলগুলো ভারতের আধিপত্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছে।
বাস্তবতা বনাম ভূ-রাজনীতি
সম্পর্ক শীতল হলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন ভারতকে বাদ দেওয়া বাংলাদেশের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিনের মতে, বাণিজ্য, পরিবহন এবং ভৌগোলিক নিরাপত্তার জন্য ভারতের ওপর নির্ভরতা বাস্তবসম্মত। কোনো বুদ্ধিমান সরকার ভারতকে পুরোপুরি উপেক্ষা করতে চাইবে না।
বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বার্ষিক ১৩.৫ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য এবং আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত থাকা সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
আসন্ন নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ কি চীনের দিকে চূড়ান্তভাবে ঝুঁকে পড়বে, নাকি ভারতের সাথে সম্পর্কের বরফ গলিয়ে এক নতুন ভারসাম্য তৈরি করবে। তবে আপাতত মাঠের রাজনীতিতে ‘ভারত বিরোধী সুর’ এবং বেইজিংয়ের ‘বিনিয়োগ কূটনীতি’— উভয়ই বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে।সূত্র : রয়টার্স





