লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাহিদুল ইসলাম : প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯৪৫) সময় সংঘটিত ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় বিশ্ববাসীকে খুব গভীরভাবে নাড়া দিয়ে যায়। উভয় বিশ্বযুদ্ধে নারী ও শিশুসহ আনুমানিক ৬ কোটির বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। যুদ্ধ ও সংঘাতের পরিবর্তে পৃথিবীব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠা ও ভবিষ্যৎ নানাবিধ মানবিক সংকট মোকাবেলার জন্য বিশ্বনেতৃত্বের যৌথ প্রচেষ্টায় ১৯৪৮ সালের ২৪ অক্টোবর যাত্রা শুরু করে বিশ্বশান্তির সর্ববৃহৎ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘ।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ১৯৪৮ সালে ইসরাইল ও আরব দেশগুলোর মধ্যে অস্ত্রবিরতি পর্যবেক্ষণের (ইউনাইটেড নেশন্স ট্রুত সুপারভিশন অর্গানাইজেশন-ইউএনটিএসও) মধ্য দিয়ে সর্বপ্রথম যাত্রা শুরু করে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন।সেই থেকে অদ্যাবধি ১২০-এর অধিক রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে প্রায় ৬৯টি শান্তিরক্ষা মিশন পরিচালনা করা হয়। যদিও জাতিসংঘ সনদে সরাসরি শান্তিরক্ষা মিশনের কোনো উল্লেখ নেই, তবুও জাতিসংঘের মূল লক্ষ্য বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় শান্তিরক্ষা মিশন একটি গুরুত্বপূর্ণ টুল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রধানত ৩টি মৌলিক নীতির ভিত্তিতে শান্তিরক্ষা মিশন পরিচালিত হয়। সেগুলো হলো—বিবাদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে শান্তিরক্ষী গ্রহণের সম্মতি, নিরপেক্ষতা এবং আত্মরক্ষা ও শান্তিরক্ষা সংক্রান্ত ম্যান্ডেট বজায় রাখা ব্যতিত কোনো ভাবেই শক্তিমত্তা বা অস্ত্রের ব্যবহার না করা।
শান্তিরক্ষীদের প্রধান কাজ হলো— (ক) একটি সংঘাত শুরু হওয়ার আগেই তা প্রতিহত করা কিংবা সংঘাত যেন প্রতিবেশী রাষ্ট্রে ছড়িয়ে না পরে তা নিশ্চিত করা; (খ) অস্ত্র বিরতির পর পরিস্থিতি শান্ত করা ও পাশাপাশি এমন পরিবেশ তৈরি করা যাতে বিবাদমান পক্ষগুলো দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তিতে পৌঁছাতে পারে; (গ) যখন কোনো শান্তিচুক্তি হাপিত হয়, তখন সেই চুক্তির সুরক্ষা, সমন্বয়, পর্যবেক্ষণ ও উভয়পক্ষের মধ্যে আহাবৃদ্ধি করার মাধ্যমে চুক্তির প্রতিটি ধাপ বাস্তবায়নে কার্যক্রম পরিচালনা করা; (ঘ) সংঘাত পরবর্তী সময়ে একটি রাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে হিতিশীল ও কার্যকর সরকার ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হতে সাহায্য করা।
শান্তিরক্ষার পাশাপাশি শান্তি স্থাপনেও শান্তিরক্ষা মিশনসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সংঘাতের পর বিদ্রোহী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্রীকরণ করা এবং তাদেরকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে শান্তিরক্ষীরা কাজ করে থাকেন। তাছাড়া সংঘাত পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা খাতের সংস্কার সাধনে সাহায্য করা, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মানবাধিকার উন্নয়নে সাহায্য করা, নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক রাখতে সহায়তা প্রদানসহ ম্যান্ডেটভুক্ত নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন।
একটি শান্তিপ্রিয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বশান্তি স্থাপন এবং শক্তির পরিবর্তে কুটনীতি ও আলোচনার ভিত্তিতে যুদ্ধ ও সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য সাংবিধানিকভাবে দায়বদ্ধ। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা মিশনের কার্যক্রমে যুক্ত হতে সর্বোচ্চ অনুপ্রেরণা পেয়ে থাকে।
১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করলেও ইউনাইটেড নেশন্স ইরান-ইরাক মিলিটারি অবজারভার্স গ্রুপ (ইউএনআইএমওজি) এ অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ যুক্ত হয় ১৯৮৮ সাল থেকে। জাতিসংঘের ৬৯টি শান্তিরক্ষা মিশনের মধ্যে ৫৪টি মিশনে বাংলাদেশ অদ্যাবধি সফলতার সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছে।
দীর্ঘ ৩০ বছরেরও অধিক পথচলায় বাংলাদেশ আজ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের গুরুত্বপূর্ণ ও অন্যতম নির্ভরযোগ্য সহযোগী হিসেবে বিশ্বসম্প্রদায়ের নিকট পরিচিতি লাভ করেছে।
তাছাড়া, দীর্ঘ সময় ধরেই বাংলাদেশ শান্তিরক্ষী প্রেরণে অন্যতম শীর্ষ দেশ হিসেবে সম্মানজনক অবস্থান অর্জন করেছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসের তথ্যমতে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সেনা ও পুলিশ সদস্য প্রেরণে বাংলাদেশ তৃতীয় বৃহত্তম অবদানকারী দেশ এবং বর্তমানে ৪,৪৮৮ জন বাংলাদেশি সেনা শান্তিরক্ষী সর্বমোট ১০টি মিশনে নিয়োজিত আছেন। এদের মধ্যে ৪,১২২ জন পুরুষ এবং ৩৬৬ জন নারী সেনাসদস্য। তারা ইয়েমেন, লিবিয়া, আবেই, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, সাইপ্রাস, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, লেবানন ও দক্ষিন সুদানসহ বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মরত আছেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন কোরের, যেমন পদাতিক, আর্টিলারি, ইঞ্জিনিয়ার্স, আর্মি সাপ্লাই কোর, সিগন্যালস, মিলিটারি পুলিশসহ অন্যান্য কোরের সেনাসদস্য এসব জাতিসংঘ মিশনে অংশগ্রহণ করেন। তন্মধ্যে ‘সদা সর্বত্র’ এই মূলমন্ত্র ধারণ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স ব্লু হেলমেট এর আওতায় পূর্ব তিমুর, সিয়েরালিয়ন, পশ্চিম সাহারা, লাইবেরিয়া, সেন্ট্রাল আফ্রিকা, আইভরিকোষ্ট, মালি, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, দক্ষিণ সুদানসহ বিভিন্ন দেশে অত্যন্ত সুনামের সাথে কাজ করে আসছে। মূলত জাতিসংঘ মিশনের ম্যান্ডেটকে সাপোর্ট দেয়ার লক্ষ্যে সেনা প্রকৌশলীরা মুবিলিটি, কাউন্টার মুবিলিটি, সারভাইবিলিটি এবং জেনারেল ইঞ্জিনিয়ারিং কাজ সমুহ করে থাকেন। বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশি সেনা প্রকৌশলীদের পেশাদারত্ব এবং অবদান প্রমাণ করে সেনা প্রকৌশলী তথা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুধু জাতীয় নিরাপত্তা প্রহরী নয়, তারা বৈশ্বিক শান্তির অন্যতম দক্ষ ও বিশ্বস্ত অংশীদার।
ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো যা সংক্ষেপে ডিআর কঙ্গো নামে পরিচিত, আফ্রিকা মহাদেশের মধ্য ভাগে অবস্থিত একটি ফ্রেঞ্চভাষী দেশ। প্রায় ১১২ মিলিয়ন জনসংখ্যার দেশটি ভূ-আয়তনের দিক থেকে আফ্রিকার ২য় বৃহৎ এবং জনসংখ্যায় ৪র্থ বৃহৎ একটি দেশ। গৃহযুদ্ধ ও নানা বিশৃঙ্খলায় নিপতিত দেশটিতে ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশের বীর সেনারা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে ‘বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ার্স কনস্ট্রাকশন (ব্যানইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন)’ সংক্ষেপে বিইসি নাম ধারণ করে অদ্যাবধি শান্তিরক্ষা সংক্রান্ত নানাবিধ অপারেশনাল, প্রশিক্ষণ, লজিস্টিক এবং কম্ব্যাট ইঞ্জিনিয়ারিং কাজ অত্যন্ত দক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও নৈপুণ্যের সাথে পালন করে আসছে। কঙ্গোতে জাতিসংঘের এই মিশন বর্তমানে ‘The United Nations Organization Stabilization Mission in the Democratic Republic of the Congo (MONUSCO)’ বা মনুষ্কো নামে পরিচিত, যা ২০১০ সালের পূর্বে মোনাক (MONUC) নামে পরিচিত ছিল।
২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি মনুস্কোতে ৭ম কন্টিনজেন্ট হিসেবে মুবনে আর্মি ক্যাম্প, সাউথ কিন্তু নামক হানে বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন-১ (বিইসি-১) নামে তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাকির আহমেদ, পিএসসি এর নেতৃত্বে মোতায়েন করা হয়। সততা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সাথে বাংলাদেশের এই কন্টিনজেন্ট অতি স্বল্প সময়ের মধ্যে অবকাঠামো নির্মাণ, জনগনের জান-মালের নিরাপত্তা প্রদানসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক প্রশংসিত হয়।
২০২৩ সাল পর্যন্ত মনুস্কোতে মোট ১৪টি সেনা প্রকৌশল কন্টিনজেন্ট শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে। মনুষ্কোতে চাইনিজ ইঞ্জিনিয়ার কন্টিনজেন্ট, ইন্দোনেশিয়ান ইঞ্জিনিয়ার কন্টিনজেন্ট ও নেপাল ইঞ্জিনিয়ার কন্টিনজেন্ট থাকলেও অসাধারণ কর্ম পরিকল্পনা, পেশাদারিত্ব, বীরত্ব এবং কার্যসম্পাদনের দ্রুততা তথা সময়ানুবর্তিতার দরুন মনুষ্কো ফোর্স সদর দপ্তর কর্তৃক Operational Readiness Inspection (ORI) এ বরাবরই বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ার কন্টিনজেন্ট ১ম স্থান অধিকার করে আসছে যা বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমুর্তি ও মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। এই অসামান্য কৃতিত্ব অর্জনের পাশাপাশি অপারেশনাল, প্রশিক্ষণ, প্রশাসনিক, লজিস্টিক এবং ইঞ্জিনিয়ার প্রজেক্ট বিষয়ক কার্যক্রম পরিচালনায় বাংলাদেশী সেনা প্রকৌশলীদের কর্মদক্ষতা মনুষ্কো ফোর্স সদর দপ্তরে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়।
বর্তমানে ডিআর কঙ্গোতে বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন কন্টিনজেন্ট-১৫ মোতায়েন রয়েছে। গত ২০ অক্টোবর ২০২৪ থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত লেঃ কর্নেল মোঃ নাহিদুল ইসলাম, পিএসসি এর নেতৃত্বে মুনিগী আর্মি ক্যাম্প, গোমা নামক স্থানে অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। উক্ত কন্টিনজেন্ট অদ্যাবধি ৭৯টি কম্ব্যাট ইঞ্জিনিয়ারিং বা নির্মাণ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছে।
শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সেনা প্রকৌশলীরা দায়িত্বপ্রাপ্ত মিশনের আত্মনির্ভরতা অর্জন, বেসামরিক লোকের নিরাপত্তা প্রদান এবং জন-হিতৈষী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম সম্পাদন করে থাকেন। এর মধ্যে যুদ্ধ প্রকৌশল এবং নির্মাণ প্রকৌশল সংক্রান্ত কাজ দুটি অতীব তাৎপর্যপূর্ণ। যুদ্ধ প্রকৌশল সংক্রান্ত কাজের মধ্যে সেনা প্রকৌশলীরা সৈন্যদের একস্থান থেকে অন্য স্থানে দ্রুত ও নিরাপদে গমনের জন্য চলাচলের পথের প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ, রুট পুনরুদ্ধার, খাদ ও নদী অতিক্রমের জন্য সেতু ও অস্থায়ী পারাপার ব্যবস্থা স্থাপন, সড়ক নির্মাণ ও মেরামত, নজরদারি, অনুসন্ধানমূলক কাজ, এমনকি বিমান চলাচলের রানওয়ে ও হেলিপ্যাড অবকাঠামো নির্মাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করে থাকেন।
অন্যদিকে, নির্মাণ প্রকৌশল সংক্রান্ত ভার্টিক্যাল কনস্ট্রাকশন ও হরিজন্টাল কনস্ট্রাকশন এই দুই ধরনের কাজ সম্পাদন করে থাকেন বাংলাদেশি সেনা প্রকৌশলীরা। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— বাঙ্কার নির্মাণ, সড়ক, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ এবং এগুলোর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, বিমানঘাঁটি নির্মাণ উল্লেখযোগ্য। এর পাশাপাশি লজিস্টিক্যাল কাজ হিসেবে বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক জরিপ পরিচালনা, সাইট পরিদর্শন ও পরিকল্পনা গ্রহণ বিষয়ক কাজ সম্পাদন করে থাকেন।
অন্যদিকে, নির্মাণ প্রকৌশল সংক্রান্ত ভার্টিক্যাল কনস্ট্রাকশন ও হরিজন্টাল কনস্ট্রাকশন এই দুই ধরনের কাজ সম্পাদন করে থাকেন বাংলাদেশি সেনা প্রকৌশলীরা। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— বাঙ্কার নির্মাণ, সড়ক, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ এবং এগুলোর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, বিমানঘাঁটি নির্মাণ উল্লেখযোগ্য। এর পাশাপাশি লজিস্টিক্যাল কাজ হিসেবে বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক জরিপ পরিচালনা, সাইট পরিদর্শন ও পরিকল্পনা গ্রহণ বিষয়ক কাজ সম্পাদন করে থাকেন।
বাংলাদেশের সেনা প্রকৌশলীদের কন্টিনজেন্ট ডিআর কঙ্গোতে নিরাপত্তা ও উন্নয়নমূলক খাতের অবদানসমূহ বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছে। বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশি সেনা প্রকৌশলী ডিআর কঙ্গোতে জাতিসংঘ মিশন মনুস্কো এর ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে ১০৩০টি কম্ব্যাট/নির্মাণ প্রকৌশল কাজ সম্পন্ন করে যার মধ্যে সংঘাতপূর্ণ ভৌগলিক দুর্গম ও পাথুরে পাহাড়ী এলাকায় স্থানীয় জনগনের স্বার্থে ১০৬ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ, ১০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণসহ অসংখ্য কালভার্ট/ব্রিজ নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেছে যা মিশনের কার্যক্রমে এবং কঙ্গোর আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। এছাড়াও বিভিন্ন সিমিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিনামুল্যে ঔষধ বিতরণ, চিকিৎসা প্রদানসহ বিভিন্ন স্কুল কলেজে শিক্ষাসামগ্রী বিতরণ করে থাকে যা ডিআর কঙ্গোর শিক্ষার প্রসারে ভূমিকা পালন করছে। এর মধ্যে বর্তমানে মোতায়েনকৃত বাংলাদেশি সেনা প্রকৌশল কন্টিনজেন্ট গত ১ বছরে মোট ৮.১৪৫ কিলোমিটার রাস্তার নির্মাণকাজ সফলতার সঙ্গে শেষ করেছে। এই কন্টিনজেন্ট সম্প্রতি (ফেব্রুয়ারি ২০২৫) দেশটির বিদ্রোহী গোষ্ঠী এম২৩ এবং স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনী এফএআরডিসি এর মধ্যকার যুদ্ধ পরবর্তীকালীন সময়ে গোমা শহরের উন্নয়নে ও স্থানীয় জনগনের সুবিধার্থে যুদ্ধপরবর্তী ধ্বংসাবশেষ অপসারণসহ মোট ৫২২ মিটার ড্রেনেজ নির্মাণ কাজ সম্পাদন করে। এখানে উল্লেখ্য যে, এসব কম্ব্যাট ইঞ্জিনিয়ারিং বা নির্মাণকাজে সেনা প্রকৌশলীদের কর্তৃক ব্যবহৃত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সকল যন্ত্রপাতি/সরঞ্জামাদি (এক্সেভেটর, লোডার, ডাম্পার, রোলার ইত্যাদি)-এর অনুকূলে ইউএন কর্তৃক প্রদত্ত রিইম্বার্সমেন্ট/ভাড়া বাবদ বাংলাদেশ সরকার প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে।
মনুষ্কোতে দায়িত্বপালন করতে গিয়ে বাংলাদেশের সেনা প্রকৌশলীরা প্রতিনিয়ত নানাবিধ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়ে থাকে। প্রথমত, বিদ্যমান যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবেলা করে সেনাদের জীবন রক্ষা করা, ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত কাজ সম্পাদন করা ও ক্যাম্পের নিরাপত্তা বজায় রাখা মুখ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি তথা ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি বিদ্রোহী গোষ্ঠী এম২৩-এর অতর্কিত হামলায় বাংলাদেশ প্রকৌশলীদের ৩টি ক্যাম্প (মুনিগী, সাকে ও রুশায়ো) মারাত্মকভাবে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পতিত হয়। ক্যাম্পের বিপরীত দুই দিক থেকে ব্যাপক গোলাগুলি ও মর্টাল শেল নিক্ষেপের ফলে ক্যাম্পের জরুরি রসদ সরবরাহ (রেশন, পানি ও জ্বালানি) মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ক্যাম্প স্থাপনায় গোলা নিক্ষেপ হয় এবং নিরাপত্তার স্বার্থে শান্তিরক্ষী সেনারা বাঙ্কারে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এর আগে,২০১২ সালে প্রাক্তন ন্যাশনাল কংগ্রেস ফর ডিফেন্স অফ দ্য পিপল সরকার এবং মোতায়েনকৃত শান্তিরক্ষীদের বিরুদ্ধে চরম বিদ্রোহ শুরু হয়। ওই বছরের ২০ জুলাই সরকারি বাহিনী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে ব্যাপক গোলাবর্ষণ শুরু হলে মিশন ক্যাম্পের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার আকস্মিক অবনতির ফলে হাজার হাজার বেসামরিক লোক অন্যত্র পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
অন্যদিকে, সেনাসদস্যরা প্রায়শই কঙ্গোর মিলিশিয়া দল/বিদ্রোহী গোষ্ঠী কর্তৃক তাদের ক্যাম্প ও কনভয়ের ওপর আগ্নেয়াস্ত্র, ল্যান্ড মাইন ও ড্রোন হামলার শিকার হয়ে থাকেন। তাছাড়া রাস্তা সংস্কার ও মেরামত কাজ সম্পাদনের সময় সেনাসদস্যদের লক্ষ্য করে প্রায়শই মিলিশিয়া দল/বিদ্রোহী গোষ্ঠী পাথর নিক্ষেপ ও গুলি ছোঁড়ে। এমতাবস্থায়, অনেক সেনাসদস্য আহত ও অনেক মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি, কঙ্গোর ভূ-প্রকৃতি সেনা প্রকৌশলীদের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। তম্মধ্যে ইঞ্জিনিয়ার ক্যাম্প এর ৮.৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত জীবন্ত আগ্নেয়গিরি নাইরোগঙ্গো উল্লেখযোগ্য। জীবন্ত আগ্নেয়গিরি নাইরোগঙ্গোর বিস্ফোরণে নির্গত লাভা কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। তন্মধ্যে ২০০২, ২০১৭, ২০২১ এবং ২০২২ সালের বিস্ফোরণ উল্লেখযোগ্য। পাহাড়ি এলাকা, ঘন বনাঞ্চল ও জলাভূমি নির্মাণ কাজ পরিচালনা করাকে কঠিন করে তুলে। দীর্ঘ বর্ষাকালে অতিবৃষ্টির ফলে এই ধরনের কাজ আরো বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়।
পরিশেষে বলা যায়, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সেনা প্রকৌশলীরা এক গৌরবের নাম। তাঁরা পেশাদারিত্ব ও কঠোর শৃঙ্খলার সঙ্গে কারিগরি দক্ষতা প্রদর্শন করে আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে সংঘাতময় এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের এই দায়িত্ববোধ ও সফলতা বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থাকে আরো সুদৃঢ় করেছে। মনুষ্কোতে বাংলাদেশ সেনা প্রকৌশলীদের অবদান প্রমাণ করে, বাংলাদেশ শুধু শান্তিরক্ষায় অংশগ্রহণকারী নয় বরং শাস্তি বিনির্মাণের নির্ভরযোগ্য অংশীদার। লেখক: পিএসসি, ইঞ্জিনিয়ার্স, বর্তমানে ডিআর কঙ্গোতে কন্টিনজেন্ট কমান্ডার হিসেবে কর্মরত।
বি:দ্র: দৈনিক কালের কণ্ঠ থেকে নেয়া





