নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ধারণক্ষমতার তিনগুণের বেশি বন্দী থাকায় চরম ভিড় ও মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। দুই হাজার ২০০ জনের ধারণক্ষমতার এ কারাগারে বর্তমানে গড়ে প্রতিদিন ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৬ হাজার বন্দী রাখা হচ্ছে। এতে বাসস্থান, খাবার, চিকিৎসা ও স্যানিটেশনসহ নানা মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চট্টগ্রামে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন নতুন কারাগার নির্মাণ না হলে এ সংকট আরও তীব্র হবে।
কারা সূত্রে জানা যায়, গত এক সপ্তাহে কারাগারে বন্দীর সংখ্যা গড়ে ছিল ৬ হাজার জন। প্রতিদিনই ধারণক্ষমতার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি বন্দী রাখায় কারাগারের কক্ষগুলোতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ৩০-৪০ জনের জায়গায় প্রায় ১০০ জন বন্দীকে রাখতে হচ্ছে। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে বন্দীদের খাবার, বিশুদ্ধ পানি, টয়লেট ব্যবহার ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে দুর্ভোগ বাড়ছে।
বিশেষ করে গরমের সময়ে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে সীমিত জনবল দিয়ে বিপুলসংখ্যক বন্দী সামলাতে গিয়ে চাপে পড়ছে কারা কর্তৃপক্ষ।কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. ইকবাল হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ২২০০ জনের ধারণক্ষমতা রয়েছে। কারাগারে বর্তমানে গড়ে প্রতিদিন ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৬ হাজার বন্দী রাখা হচ্ছে। বর্তমানে কারাগারের প্রতিটি কক্ষই ব্যবহার করা হচ্ছে। বন্দীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় সব ধরনের সমস্যাই প্রকট আকার ধারণ করেছে।
চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপ-মহাপরিদর্শক মো. ছগির মিয়া জানান, দীর্ঘদিন ধরেই নতুন কারাগার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় জমি চিহ্নিত করা হলেও দখলমুক্ত না হওয়ায় তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। বর্তমানে ৩০ থেকে ৫০ একর জমি খোঁজা হচ্ছে, যেখানে আদালত, হাসপাতাল ও পুলিশ লাইনের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ থাকবে।
মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাইমুল ইসলাম আসাদ জানান, কারাগার কেবল শাস্তির স্থান নয়, এটি সংশোধনাগার। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে বন্দীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এই পরিস্থিতি বন্দীদের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি ও পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, কারাগারের প্রধান সমস্যা হলো অতিরিক্ত ভিড়, স্বাস্থ্যসেবা, স্যানিটেশন ও চিকিৎসার ঘাটতি। আমাদের ফরমাল ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম প্রয়োজনীয় জনবল ও সক্ষমতার অভাবে চাপে রয়েছে। তাই এর পাশাপাশি ইনফরমাল বিচারব্যবস্থা—সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর করতে হবে।
তিনি আরও জানান, এতে মামলার চাপ কমবে, ভিকটিম-অফেন্ডার সমঝোতা বাড়বে এবং অপরাধ পুনরাবৃত্তি হ্রাস পাবে। গ্রাম আদালতসহ স্থানীয় উদ্যোগগুলো শক্তিশালী করা জরুরি। কারাগারকে শাস্তির জায়গা নয়, সংশোধনাগার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে অপরাধীরা সংশোধিত হয়ে সমাজে ফিরে আসতে পারে।





